সাধু বেনেডিক্ট মঠের ওয়েব-সাইট - মহেশ্বরপাশা - খুলনা - বাংলাদেশ
[অনলাইন পঞ্জিকা]
পুণ্য সপ্তাহ

গেথসেমানি বাগানে প্রার্থনারত প্রভু যিশু
   
অনুষ্ঠানসমূহ: ভস্ম বুধবার | ১ম রবিবার | ২য় রবিবার | ৩য় রবিবার | ৪র্থ রবিবার | ৫ম রবিবার | তালপত্র রবিবার | পুণ্য বৃহস্পতিবার | পুণ্য শুক্রবার | পুণ্য শনিবার

প্রভুর যন্ত্রণাভোগ তালপত্র রবিবার
একটা গাধার পিঠে আসন নিয়ে
যিশু যেরুসালেমে প্রবেশ করেন।
১। যেরুসালেমে প্রভুর প্রবেশের স্মরণানুষ্ঠান—শোভাযাত্রা

২। নিজ নিজ ঘরের বাইরে মা-বাবা ও ছেলেমেয়েরা সমবেত হবেন; তাঁদের হাতে থাকবে খেজুর বা তাল গাছের পাতা। প্রাচীন প্রথা অনুসারে ক্রুশটিকেও অলঙ্কৃত করা যেতে পারে।

৩। ধুয়ো: সকলে নিচের ধুয়ো সামসঙ্গীতের সুরে গাইবেন।
দাউদসন্তানের হোসান্না;
যিনি প্রভুর নামে আসছেন,
তিনি ধন্য;
ঊর্ধ্বলোকে হোসান্না!

৪। ‘পিতা ও পুত্র ও পবিত্র আত্মার নামে’ উচ্চারণ করতে করতে অনুষ্ঠাতা ও ভক্তগণ ক্রুশের চিহ্ন করেন। তারপর অনুষ্ঠাতা বলেন,
প্রিয়জনেরা,
তপস্যাকালের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত
আমরা তপস্যা ও দয়াকর্মের মধ্য দিয়ে
নিজেদের অন্তর প্রস্তুত করেছি।
আজ সমগ্র খ্রিষ্টমণ্ডলীর সঙ্গে এক হয়ে
আমরা আমাদের প্রভুর পাস্কা-রহস্যের
অর্থাৎ তাঁর যন্ত্রণাভোগ ও পুনরুত্থানের সূচনা-অনুষ্ঠানে যোগ দিতে
এখানে সমবেত হয়েছি।
কেননা ঠিক এ রহস্য সম্পন্ন করার জন্যই
তিনি তাঁর আপন পবিত্র নগরী যেরুসালেমে প্রবেশ করেছিলেন।
তাই এসো, আমাদের পরিত্রাণের নগরীতে প্রভুর প্রবেশের কথা
বিশ্বাস ও ভক্তি ভরে স্মরণ করে তাঁকে অনুসরণ করি,
যেন তাঁর অনুগ্রহে ক্রুশের সহভাগী হয়ে
তাঁর পুনরুত্থান ও জীবনেরও অংশী হতে পারি।

এসো, প্রার্থনা করি।
হে সর্বশক্তিমান সনাতন ঈশ্বর,
এই পাতাগুলোকে তোমার আশীর্বাদে পবিত্র করে তোল;
আমরা যারা আনন্দের সঙ্গে খ্রিষ্ট রাজার অনুসরণ করি,
যেন একদিন তাঁর দ্বারা সনাতন যেরুসালেমে পৌঁছতে পারি।
বিশ্বরাজ ও জীবনেশ্বর রূপে তিনি যুগে যুগে বিরাজমান।
সকলে: আমেন।

৫। সুসমাচার
মার্ক-রচিত পবিত্র সুসমাচার থেকে পাঠ (১১:১-১০)

যেরুসালেমের কাছাকাছি এসে তাঁরা যখন জৈতুন পর্বতে বেথ্ফাগে ও বেথানিয়া গ্রামে এসে পৌঁছলেন, তখন যিশু নিজের শিষ্যদের মধ্য থেকে দু’জনকে পাঠিয়ে দিলেন; তাঁদের বললেন, ‘তোমরা সামনের ওই গ্রামে যাও; সেখানে প্রবেশ করামাত্র দেখতে পাবে, একটা গাধা বাঁধা আছে যার উপরে কোন মানুষ কখনও বসেনি; তার বাঁধন খুলে নিয়ে এসো। আর যদি কেউ তোমাদের বলে, তোমরা এ করছ কেন? তোমরা বলবে, প্রভুর এর দরকার আছে; কিন্তু শীঘ্রই এটাকে এখানে ফিরিয়ে পাঠাবেন।’
তাঁরা গিয়ে দেখতে পেলেন, একটা গাধার বাচ্চা একটা দরজার কাছে, রাস্তার উপরেই, বাঁধা রয়েছে, তখন তার বাঁধন খুলতে লাগলেন। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা লোকদের মধ্যে কেউ কেউ বলল, ‘গাধার বাচ্চার বাঁধন খুলে কি করছ?’ তখন যিশু যেমন বলেছিলেন, তাঁরা তাদের সেইমত বললেন, আর তারা তাঁদের বাচ্চাটা নিয়ে যেতে দিল।
পরে যিশুর কাছে গাধার বাচ্চাটাকে এনে তার পিঠের উপরে নিজেদের চাদর পেতে দিলেন, আর তিনি তার উপরে আসন নিলেন। তখন অনেকে নিজ নিজ চাদর পথে পেতে দিল, ও অন্যান্য লোক মাঠ থেকে ডালপালা কেটে পথে ছড়িয়ে দিল। যে সকল লোক আগে আগে চলছিল আর যারা পিছু পিছু আসছিল, তারা চিৎকার করে বলছিল: ‘হোসান্না; যিনি প্রভুর নামে আসছেন, তিনি ধন্য; ধন্য আমাদের পিতা দাউদের আসন্ন রাজ্য; ঊর্ধ্বলোকে হোসান্না!’
প্রভুর বাণী।

৬। শোভাযাত্রা
অনুষ্ঠাতা:
প্রিয়জনেরা, এসো, সেই কালের আনন্দ-মুখর জনতার অনুকরণে
আমরাও যিশুর জয় করতে করতে শান্তিতে এগিয়ে যাই।
সকলে: আমেন

যদি ধূপ ব্যবহার করা হয়, তবে সকলের আগে আগে ধূপ-পাত্র নিয়ে একজন চলবেন, তাঁর পিছনে খেজুর পাতায় অলঙ্কৃত ক্রুশ ধরে আর একজন চলবেন; তাঁদের পিছনে সুসমাচার-পুস্তক হাতে আর একজন, এবং তাঁদের পিছনে পাতা হাতে সকল ভক্তগণ চলবেন।
শোভাযাত্রা এগিয়ে যেতে যেতে ভক্তগণ সাম ২৪ গান করবেন:—
সাম ২৪
ধুয়ো:
জলপাইগাছের ডালপাতা হাতে হিব্রু শিশুদল
প্রভুকে অভ্যর্থনা করতে বেরিয়ে গেল,
তারা চিৎকার করে বলছিল:
ঊর্ধ্বলোকে হোসান্না!   [ধুয়ো]

প্রভুরই তো পৃথিবী ও তার যত বস্তু,
জগৎ ও জগদ্বাসী সকল;
তিনি সাগরের জলরাশির উপরে তা স্থাপন করলেন,
নদনদীর উপরে দৃঢ়প্রতিষ্ঠিত করলেন।   [ধুয়ো]

প্রভুর পর্বতে কে গিয়ে উঠবে,
তাঁর পবিত্রধামে কে থাকতে পারবে?
সেই তো, যার হাত নির্দোষ, শুদ্ধ যার হৃদয়,
অলীকতার প্রতি যে তোলে না প্রাণ, নেয় না ছলনার শপথ।   [ধুয়ো]

জলপাইগাছের ডালপাতা হাতে হিব্রু শিশুদল
প্রভুকে অভ্যর্থনা করতে বেরিয়ে গেল,
তারা চিৎকার করে বলছিল:
ঊর্ধ্বলোকে হোসান্না!   [ধুয়ো]

সেই তো পাবে প্রভুর কাছ থেকে আশিসধারা,
তার ত্রাণেশ্বরের কাছ থেকে ধর্মময়তা পাবে।
এই তো তাঁর সেই অনুসন্ধানী বংশের মানুষ,
তোমার শ্রীমুখ অন্বেষী, যাকোবের ঈশ্বর।   [ধুয়ো]

হে তোরণ, উত্তোলন কর শির, উত্তোলিত হও, সনাতন সিংহদ্বার!
প্রবেশ করুন গৌরবের রাজা।
কে এই গৌরবের রাজা?
শক্তিমান পরাক্রমী প্রভু, যুদ্ধে পরাক্রমী প্রভু।   [ধুয়ো]

হে তোরণ, উত্তোলন কর শির, উত্তোলিত হও, সনাতন সিংহদ্বার!
প্রবেশ করুন গৌরবের রাজা।
এই গৌরবের রাজা, তিনি কে?
সেনাবাহিনীর প্রভু, তিনিই গৌরবের রাজা।   [ধুয়ো]

৭। সকলে ঘরে প্রবেশ করলে শোভাযাত্রা অনুষ্ঠান সমাপ্ত।

৮। সমাবেশ প্রার্থনা: [অনুষ্ঠাতা] এসো, প্রার্থনা করি।
হে সর্বশক্তিমান সনাতন ঈশ্বর,
মানবজাতি যেন অনুকরণের জন্য নম্রতার একটি আদর্শ পেতে পারে,
সেজন্যে তুমি চেয়েছিলে,
আমাদের ত্রাণকর্তা মানবদেহ ধারণ ক’রে ক্রুশ-মৃত্যু বরণ করবেন।
আশীর্বাদ কর: তাঁর যন্ত্রণাভোগের স্মৃতি অন্তরে বরণ ক’রে
আমরা যেন তাঁর পুনরুত্থানেরও সহভাগী হতে পারি।
পবিত্র আত্মার ঐক্যে, তোমার সঙ্গে, বিশ্বরাজ ও জীবনেশ্বর রূপে
তিনি যুগে যুগে বিরাজমান।

৯। প্রথম পাঠ
নবী ইসাইয়ার পুস্তক থেকে পাঠ (৫০:৪-৭)

প্রভু পরমেশ্বর আমাকে এমন দীক্ষাপ্রাপ্ত জিহ্বা দিয়েছেন,
যেন আমি বুঝতে পারি ক্লান্ত মানুষকে কেমন সান্ত্বনার বাণী দিতে হয়;
প্রতি সকালে তিনি আমার কান জাগ্রত করে তোলেন,
যেন আমি দীক্ষাপ্রাপ্ত শিষ্যের মত শুনতে পাই।
প্রভু পরমেশ্বর আমার কান উন্মুক্ত করেছেন;
আর আমি প্রতিবাদ করিনি, পিছিয়ে যাইনি।
যারা আমাকে মারছিল, তাদের দিকে পিঠ,
যারা আমার দাড়ি ছিঁড়ে নিচ্ছিল, তাদের দিকে গাল পেতে দিলাম;
অপমান ও থুথু থেকে মুখ ঢেকে রাখিনি।
প্রভু পরমেশ্বর আমার সহায়তা করেন,
এজন্যই আমি বিহ্বল হই না,
এজন্যই পাথরের মতই কঠিন করে তুলেছি আমার মুখ।
আমি জানি, আমাকে লজ্জিত হতে হবে না।
ঈশ্বরের বাণী।

১০। সামসঙ্গীত ২২
ধুয়ো:
ঈশ্বর আমার, ঈশ্বর আমার,
আমাকে ত্যাগ করেছ কেন?

আমাকে দেখে সকলে উপহাস করে,
মুখ বেঁকিয়ে নাড়ায় মাথা—
‘প্রভুর উপর ও নির্ভর করেছে, ওকে তিনিই রেহাই দিন;
ওর প্রিয়জন বলে ওকে তিনিই উদ্ধার করুন।’   [ধুয়ো]

কুকুরের পাল আমাকে ঘিরে ফেলেছে,
চারদিকে দুরাচারের দল;
আমার হাত, আমার পা বিঁধে ফেলেছে ওরা,
আমি আমার সকল হাড় গুনতে পারি।   [ধুয়ো]

ওরা নিজেদের মধ্যে আমার জামাকাপড় ভাগ করে,
আমার পোশাক নিয়ে গুলিবাঁট করে।
তুমি কিন্তু, ওগো প্রভু, দূরে থেকো না,
ওগো শক্তি আমার, আমার সহায়তায় শীঘ্রই এসো।   [ধুয়ো]

আমি আমার ভাইদের কাছে তোমার নাম প্রচার করব,
তোমার প্রশংসা করব জনসমাবেশের মাঝে।
তাঁর প্রশংসা কর তোমরা, প্রভুভীরু; তাঁর গৌরবকীর্তন কর, সমগ্র যাকোবকুল,
তাঁকে শ্রদ্ধা জানাও, সমগ্র ইস্রায়েলকুল।   [ধুয়ো]

১১। দ্বিতীয় পাঠ
ফিলিপ্পীয়দের কাছে প্ররেরিতদূত সাধু পলের পত্র থেকে পাঠ (২:৬-১১)

অবস্থায় ঈশ্বর হয়েও যিশু ঈশ্বরের সঙ্গে তাঁর সমতুল্যতাকে আঁকড়ে ধরার বস্তু মনে করলেন না; বরং দাসের অবস্থা ধারণ করে ও মানুষের সাদৃশ্য আপন করে তিনি নিজেকে রিক্ত করলেন; আকারে প্রকারে মানুষের মত আবির্ভূত হয়ে তিনি মৃত্যু পর্যন্ত, এমনকি ক্রুশমৃত্যু পর্যন্তই নিজেকে বাধ্য করায় নিজেকে অবনমিত করলেন।
আর এইজন্য ঈশ্বর তাঁকে উন্নীত করলেন, ও তাঁকে দিলেন সেই নাম, সকল নামের চেয়ে শ্রেষ্ঠ যে নাম, যেন যিশু-নামে স্বর্গে মর্তে ও ভূগর্ভে প্রতিটি জানু আনত হয়, ও পিতা ঈশ্বরের গৌরবার্থে প্রতিটি জিহ্বা স্বীকার করে, ‘যিশুখ্রিষ্টই প্রভু’।
ঈশ্বরের বাণী।

১২। সুসমাচার বরণ-গীতি
প্রণাম প্রভু যিশু, মহাপ্রশংসা ও মহাবন্দনার যোগ্য তুমি।
খ্রিষ্ট আমাদের জন্য মৃত্যু পর্যন্ত,
এমনকি ক্রুশমৃত্যু পর্যন্তই নিজেকে বাধ্য করলেন।
এইজন্য ঈশ্বর তাঁকে উন্নীত করলেন
ও তাঁকে দিলেন সেই নাম, সকল নামের চেয়ে শ্রেষ্ঠ যে নাম।
প্রণাম প্রভু যিশু, মহাপ্রশংসা ও মহাবন্দনার যোগ্য তুমি।

১৩। সুসমাচার
[ ✚ চিহ্নিত অংশগুলি খ্রিষ্টের উক্তি। ★ চিহ্নিত অংশগুলি অন্য লোকের উক্তি। ♦ চিহ্নিত অংশগুলি কোন দলের বা জনতার উক্তি। ➪ চিহ্নিত অংশগুলি কাহিনী-মূলক অংশ, তা পাঠকই পড়বেন।]
মার্ক-রচিত আমাদের প্রভু যিশুখ্রিষ্টের যন্ত্রণাভোগ-কাহিনী (১৪:১–১৫:৪৭)

 ➪ দু’ দিন পর পাস্কাপর্ব ও খামিরবিহীন রুটি পর্ব: সেসময়ে প্রধান যাজকেরা ও শাস্ত্রীরা কীভাবে যিশুকে কৌশলে গ্রেপ্তার করে তাঁর প্রাণদণ্ড ঘটানো যায় তেমন পথ খোঁজ করছিলেন; কেননা তাঁরা বললেন,
‘পর্বের সময়ে নয়, পাছে লোকদের মধ্যে গোলমাল সৃষ্টি হয়।’
 ➪ যিশু বেথানিয়ায় চর্মরোগী সিমোনের বাড়িতে ছিলেন, এমন সময় তিনি ভোজে বসলে একজন স্ত্রীলোক সাদা ফটিকের একটা পাত্রে বিশুদ্ধ বহুমূল্য সুগন্ধি জটামাংসীর তেল নিয়ে এল; সে পাত্রটা ভেঙে তাঁর মাথায় তেল ঢেলে দিল। সেখানে কয়েকজন লোক ক্ষুব্ধ হয়ে একে অপরকে বলল,
‘তেলের অমন অপচয় কেন? এই তেল বিক্রি করলে তিনশ’ রুপোর টাকার চেয়ে বেশিই পাওয়া যেত, আর তা গরিবদের দিয়ে দেওয়া যেত!’
 ➪ আর তারা সেই স্ত্রীলোকের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করল। কিন্তু যিশু বললেন,
‘একে ছাড়; একে কষ্ট দিচ্ছ কেন? এ আমার প্রতি যা করল, তা উত্তম কাজ। গরিবেরা তো তোমাদের কাছে সর্বদাই রয়েছে; তোমরা যখন ইচ্ছা কর, তাদের উপকার করতে পার; কিন্তু আমাকে সর্বদা কাছে পাচ্ছ না। সে যা করতে পারত, তা করেছে; আগে এসে সমাধির লক্ষ্যেই আমার দেহে সুগন্ধি তেল ঢেলে দিল। আর আমি তোমাদের সত্যি বলছি, সমগ্র জগতে যেইখানে সুসমাচার প্রচারিত হবে, সেখানে এর এই কাজের কথাও এর স্মরণে বলা হবে।’
 ➪ যুদা ইস্কারিয়োৎ, বারোজনের মধ্যে একজন, যিশুকে প্রধান যাজকদের হাতে তুলে দেবার অভিপ্রায়ে তাঁদের কাছে গেলেন। তাঁরা শুনে আনন্দিত হলেন, এবং তাঁকে টাকা দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিলেন; আর তিনি তাঁকে তুলে দেবার জন্য উপযুক্ত সুযোগ খুঁজতে লাগলেন।
খামিরবিহীন রুটি পর্বের প্রথম দিন, যেদিন পাস্কা-মেষশাবক বলি দেওয়া হত, সেদিন শিষ্যেরা তাঁকে বললেন,
‘আমরা কোথায় গিয়ে আপনার পাস্কাভোজের ব্যবস্থা করব? আপনার ইচ্ছা কী?’
 ➪ তাই তিনি নিজের শিষ্যদের মধ্য থেকে দু’জনকে পাঠিয়ে দিলেন; তাঁদের বললেন,
‘তোমরা শহরে গেলে এমন একজন লোক তোমাদের সামনে পড়বে, যে এক কলসি জল বয়ে নিয়ে আসছে; তোমরা তার অনুসরণ কর; আর সে যে বাড়িতে প্রবেশ করে, সেই বাড়ির মালিককে গিয়ে বল, গুরু একথা বলছেন, আমি যেখানে আমার শিষ্যদের সঙ্গে পাস্কাভোজ পালন করব, আমার সেই ঘর কোথায়? তখন সেই লোক উপরতলায় একটা বড় সাজানো ঘর তোমাদের দেখিয়ে দেবে—ঘরটা প্রস্তুত; তোমরা সেইখানে আমাদের জন্য ব্যবস্থা কর।’
 ➪ শিষ্যেরা রওনা হলেন, ও শহরে গিয়ে, তাঁর কথামত সবকিছু পেলেন, ও পাস্কাভোজের ব্যবস্থা করলেন।
পরে, সন্ধ্যা হলে তিনি সেই বারোজন শিষ্যের সঙ্গে সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। তাঁরা বসেছেন ও খাচ্ছেন, এমন সময়ে যিশু বললেন,
‘আমি তোমাদের সত্যি বলছি, তোমাদের এমন একজন আমার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করতে যাচ্ছে, যে আমার সঙ্গে খাচ্ছে!’
 ➪ তখন তাঁরা দুঃখক্লিষ্ট হলেন ও একে একে তাঁকে বলতে লাগলেন,
‘সে কি আমি?’
 ➪ তাঁদের তিনি বললেন,
‘সে এই বারোজনের মধ্যে একজন; সে আমার সঙ্গে বাটিতে হাত ডুবিয়ে রাখছে। হ্যাঁ, মানবপুত্রের বিষয়ে যেমন লেখা আছে, তিনি চলেই যাচ্ছেন, কিন্তু ধিক্‌ সেই মানুষকে, যার দ্বারা মানবপুত্রের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়; সে যদি না জন্মাত, তার পক্ষে ভালই হত।’
 ➪ পরে, তাঁদের ভোজ চলছে, এমন সময়ে তিনি রুটি গ্রহণ করে নিয়ে ‘ধন্য’ স্তুতিবাদ উচ্চারণ করে তা ছিঁড়ে তাঁদের দিলেন, এবং বললেন,
‘গ্রহণ করে নাও, এ আমার দেহ।’
 ➪ পরে তিনি একটা পানপাত্র গ্রহণ করে নিয়ে ধন্যবাদ-স্তুতি উচ্চারণ করে তা তাঁদের দিলেন, আর তাঁরা সকলেই তা থেকে পান করলেন; আর তিনি তাঁদের বললেন,
‘এ আমার রক্ত, সন্ধিরই রক্ত, যা অনেকের জন্য পাতিত। আমি তোমাদের সত্যি বলছি, যে দিনে ঈশ্বরের রাজ্যে এই রস নতুন পান করব, সেইদিন পর্যন্ত আমি আঙুরফলের রস আর কখনও পান করব না।’
 ➪ এবং সামসঙ্গীত গান করে তাঁরা জৈতুন পর্বতের দিকে বেরিয়ে পড়লেন।
তখন যিশু তাঁদের বললেন,
‘তোমাদের সকলের পতন হবে, কেননা লেখা আছে, আমি মেষপালককে আঘাত করব, তাতে মেষগুলোকে বিক্ষিপ্ত করা হবে। কিন্তু আমার পুনরুত্থানের পর আমি তোমাদের আগে আগে গালিলেয়ায় যাব।’
 ➪ এতে পিতর তাঁকে বললেন,
‘আপনার জন্য যদিও সকলের পতন হয়, তবু আমার পতন হবে না।’
 ➪ যিশু তাঁকে বললেন,
‘আমি তোমাকে সত্যি বলছি: আজ, এই রাত্রে, মোরগ দু’বার ডাকবার আগে তুমি তিনবার আমাকে অস্বীকার করবে।’
 ➪ কিন্তু তিনি আরও অধিক জোরে বলে উঠলেন,
‘যদি আপনার সঙ্গে মরতেও হয়, আমি আপনাকে কখনও অস্বীকার করব না।’
 ➪ অন্য সকলেও একই কথা বললেন।

[গেথসেমানি বাগানে যিশু]

তাঁরা গেথসেমানি নামে একখণ্ড জমিতে গিয়ে পৌঁছলেন; তিনি নিজ শিষ্যদের বললেন,
‘তোমরা এখানে বস, আর আমি প্রার্থনা করি।’
 ➪ তিনি পিতর, যাকোব ও যোহনকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন, এবং আতঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন হতে লাগলেন। তখন তিনি তাঁদের বললেন,
‘আমার প্রাণ শোকে মৃতই যেন; তোমরা এখানে থাক ও জেগে থাক।’
 ➪ আর খানিকটা এগিয়ে গিয়ে তিনি মাটিতে পড়ে প্রার্থনা করলেন, সম্ভব হলে যেন সেই ক্ষণ তাঁর কাছ থেকে চলে যায়। তিনি বললেন:
‘আব্বা, পিতা, সবই তোমার সাধ্য; আমা থেকে এই পানপাত্র দূর করে দাও, কিন্তু আমার যা ইচ্ছা তা নয়, তোমার যা ইচ্ছা তা-ই হোক।’
 ➪ ফিরে এসে তিনি দেখলেন, তাঁরা ঘুমিয়ে পড়েছেন; তবে তিনি পিতরকে বললেন,
‘সিমোন, তুমি কি ঘুমিয়ে পড়েছ? এক ঘণ্টাও কি জেগে থাকবার শক্তি হয়নি? জেগে থাক ও প্রার্থনা কর, যেন তোমাদের পরীক্ষার সম্মুখীন না হতে হয়; আত্মা ইচ্ছুক বটে, কিন্তু মাংস দুর্বল।’
 ➪ আর তিনি আবার গিয়ে সেই একই কথা বলে প্রার্থনা করলেন। তিনি আবার ফিরে এসে দেখলেন, তাঁরা ঘুমিয়ে পড়েছেন, কেননা তাঁদের চোখ ভারী হয়ে পড়েছিল; তাছাড়া তাঁরা জানতেন না, উত্তরে তাঁকে কী বলবেন। তৃতীয়বারের মত ফিরে এসে তিনি তাঁদের বললেন,
‘এবার ঘুমাও ও বিশ্রাম কর; যা হওয়ার হয়েছে! ক্ষণটা এসে গেছে; দেখ, মানবপুত্রকে পাপীদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। ওঠ! এবার যাই; দেখ, আমার প্রতি যে বিশ্বাসঘাতকতা করতে যাচ্ছে, সে কাছে আসছে।’
 ➪ তিনি তখনও কথা বলছেন, তখনই যুদা, সেই বারোজনের একজন, এসে পড়লেন, ও তাঁর সঙ্গে এল খড়্গ ও লাঠি নিয়ে প্রধান যাজকদের, শাস্ত্রীদের ও জাতির প্রবীণবর্গের কাছ থেকে আসা বহু লোক। ওই বিশ্বাসঘাতক তাদের এই সঙ্কেত দিয়ে বলেছিলেন,
‘আমি যাকে চুম্বন করব, লোকটি সে-ই; তাকে গ্রেপ্তার করে সাবধানে নিয়ে যাও।’
 ➪ তাই তিনি এসে তখনই তাঁর কাছে এগিয়ে গিয়ে বললেন,
‘রাব্বি!’
 ➪ এবং তাঁকে চুম্বন করলেন। তখন তারা তাঁকে ধরে গ্রেপ্তার করল। কিন্তু যাঁরা পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁদের একজন খড়্গ বের করে মহাযাজকের দাসকে আঘাত করে তার একটা কান কেটে ফেললেন। তখন যিশু তাদের উদ্দেশ করে বললেন,
‘তোমরা কি আমাকে ঠিক যেন একটা দস্যুরই মত খড়্গ ও লাঠি নিয়ে ধরতে বেরিয়েছ? আমি প্রতিদিন মন্দিরে তোমাদের মধ্যে থেকে উপদেশ দিয়েছি, তখন তো আমাকে গ্রেপ্তার করলে না! কিন্তু শাস্ত্রবাণী পূর্ণ হওয়া চাই।’
 ➪ তখন শিষ্যেরা সকলে তাঁকে ত্যাগ করে পালিয়ে গেলেন। একটি তরুণ, গায়ে শুধু একটা চাদর জড়িয়ে তাঁর অনুসরণ করতে লাগল; তারা তাকে ধরল, কিন্তু সে চাদরটা ফেলে উলঙ্গ হয়েই পালিয়ে গেল।

[মহাযাজকের সামনে যিশু]

তখন তারা যিশুকে মহাযাজকের কাছে নিয়ে গেল; তাঁর সঙ্গে প্রধান যাজকেরা, প্রবীণবর্গ ও শাস্ত্রীরা সমবেত ছিলেন। পিতর দূরে থেকে মহাযাজকের প্রাঙ্গণের ভিতর পর্যন্ত তাঁর পিছু পিছু গেলেন, এবং অনুচারীদের সঙ্গে বসে আগুন পোহাতে লাগলেন।
প্রধান যাজকেরা ও সমস্ত মহাসভা যিশুকে প্রাণদণ্ড দেবার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে কোন একটা সাক্ষ্য খুঁজছিলেন, কিন্তু পেলেন না। অনেকেই তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যাসাক্ষ্য দিল বটে, কিন্তু তাদের সাক্ষ্য মিলছিল না। তখন কয়েকজন দাঁড়িয়ে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যাসাক্ষ্য দিয়ে বলল,
‘আমরা ওকে একথা বলতে শুনেছি, আমি মানুষের হাতে তৈরী এই পবিত্রধাম ভেঙে ফেলব, আর তিন দিনের মধ্যে আর একটা গেঁথে তুলব যা মানুষের হাতে তৈরী নয়।’
 ➪ কিন্তু এতেও তাদের সাক্ষ্য মিলল না। তখন মহাযাজক সভার মধ্যে উঠে দাঁড়িয়ে যিশুকে জিজ্ঞাসা করলেন,
‘তোমার বিরুদ্ধে এরা যে সাক্ষ্য দিচ্ছে, তাতে তুমি কি কিছুই উত্তর দেবে না?’
 ➪ কিন্তু তিনি নীরব ছিলেন, কোন উত্তর দিলেন না। মহাযাজক তাঁকে আবার জিজ্ঞাসা করলেন,
‘তুমি কি সেই খ্রিষ্ট? ধন্য যিনি, তুমি কি তাঁর পুত্র?’
 ➪ যিশু বললেন,
‘আমিই আছি! আর আপনারা মানবপুত্রকে পরাক্রমের ডান পাশে বসে থাকতে ও আকাশের মেঘবাহনে আসতে দেখবেন।’
 ➪ তখন মহাযাজক নিজের পোশাক ছিঁড়ে ফেললেন; বললেন,
‘সাক্ষীতে আমাদের আর কী দরকার? আপনারা তো ঈশ্বরনিন্দা শুনলেন; আপনাদের ধারণা কী?’
 ➪ তাঁরা সকলে তাঁর বিরুদ্ধে রায় দিলেন যে, তিনি মৃত্যুর যোগ্য।
তখন কেউ কেউ তাঁর গায়ে থুথু দিতে লাগলেন ও তাঁর মুখ ঢেকে তাঁকে ঘুষি মারতে লাগলেন, এবং বলতে লাগলেন,
‘দিব্যজ্ঞান দেখাও দেখি!’
 ➪ যত অনুচারীরাও তাঁকে চপেটাঘাত করতে লাগল।
এদিকে পিতর তখন নিচে প্রাঙ্গণে রয়েছেন, এমন সময়ে এক দাসী এল; পিতরকে আগুন পোহাতে দেখে সে তাঁর দিকে তাকিয়ে বলল,
‘তুমিও তো সেই নাজারেথের যিশুর সঙ্গে ছিলে।’
 ➪ কিন্তু তিনি অস্বীকার করে বললেন,
‘তুমি যে কী বলছ, আমি তা জানিও না, বুঝিও না।’
 ➪ পরে তিনি বের হয়ে ফটকের কাছে গেলেন, আর সেই দাসী তাঁকে দে’খে, যারা কাছে দাঁড়িয়ে ছিল, তাদেরও বলতে লাগল,
‘এই লোক তাদের একজন।’
 ➪ কিন্তু তিনি আবার অস্বীকার করলেন। কিছুক্ষণ পরে, যারা কাছে দাঁড়িয়ে ছিল, তারা পিতরকে আবার বলল,
‘সত্যিই তুমি তাদের একজন, কেননা তুমি গালিলেয়ার মানুষ।’
 ➪ কিন্তু তিনি অভিশাপ ও শপথ করে বলতে লাগলেন,
‘তোমরা যে লোকের কথা বলছ, তাকে আমি চিনি না।’
 ➪ আর তখনই মোরগটা দ্বিতীয়বার ডেকে উঠল, এবং এই যে কথা যিশু তাঁকে বলেছিলেন, ‘মোরগ দু’বার ডাকবার আগে তুমি তিনবার আমাকে অস্বীকার করবে’, তা পিতরের মনে পড়ল; এবং শীঘ্রই বাইরে গিয়ে কেঁদে ফেললেন।

[পিলাতের সামনে যিশু]

 ➪ সকাল হতে না হতেই প্রবীণবর্গ ও শাস্ত্রীদের সঙ্গে প্রধান যাজকেরা ও সমস্ত মহাসভা মন্ত্রণা করে যিশুকে বেঁধে নিয়ে গিয়ে পিলাতের হাতে তুলে দিলেন। পিলাত তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন,
‘তুমি কি ইহুদীদের রাজা?’
 ➪ উত্তরে তিনি তাঁকে বললেন,
‘আপনি নিজেই কথাটা বললেন।’
 ➪ তখন প্রধান যাজকেরা তাঁর বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ আনতে লাগলেন। পিলাত তাঁকে আবার জিজ্ঞাসা করলেন,
‘তুমি কি কিছুই উত্তর দেবে না? দেখ, ওঁরা তোমার বিরুদ্ধে কত কি অভিযোগ আনছেন!’
 ➪ কিন্তু যিশু আর কোন উত্তর দিলেন না; এতে পিলাত খুবই আশ্চর্য হলেন।
পর্বের সময়ে তিনি লোকদের জন্য এমন এক বন্দিকে মুক্ত করতেন যাকে তারা চাইত। সেসময়ে বারাব্বাস নামে একজন লোক বিদ্রোহীদের সঙ্গে কারারুদ্ধ ছিল, তারা বিদ্রোহের সময়ে নরহত্যাও করেছিল। লোকদের জন্য পিলাতের যা করার প্রথা ছিল, জনতা এসে তা দাবি করতে লাগল। পিলাত তাদের উদ্দেশ করে বললেন,
‘তোমাদের ইচ্ছা কি, আমি তোমাদের জন্য ইহুদীদের রাজাকে মুক্ত করে দেব?’
 ➪ তিনি তো জানতেন যে, প্রধান যাজকেরা হিংসার জোরেই তাঁকে তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধান যাজকেরা জনতাকে প্ররোচিত করলেন, তারা যেন বরং বারাব্বাসেরই মুক্তি চেয়ে নেয়। তখন পিলাত আবার এই বলে তাদের উদ্দেশ করে বললেন,
‘তবে তোমরা যাকে ইহুদীদের রাজা বলে ডাক, তাকে কী করব?’
 ➪ উত্তরে তারা চিৎকার করে বলে উঠল,
‘ওকে ক্রুশে দাও।’
 ➪ তিনি তাদের বললেন,
‘কেন? সে কী অপরাধ করেছে?’
 ➪ কিন্তু তারা আরও জোরে চিৎকার করে বলল,
‘ওকে ক্রুশে দাও।’
 ➪ তখন পিলাত জনতাকে খুশি করার জন্য তাদের জন্য বারাব্বাসকে মুক্ত করে দিলেন, ও যিশুকে কশাঘাত করিয়ে ক্রুশে দেবার জন্য তুলে দিলেন।
আর সৈন্যেরা তাঁকে প্রাঙ্গণের মধ্যে, অর্থাৎ শাসক-ভবনের ভিতরে নিয়ে গিয়ে গোটা সেনাদলকে ডেকে জড় করল; আর তাঁকে বেগুনি রঙের পোশাক পরিয়ে দিল, এবং একটা কাঁটার মুকুট গেঁথে তা তাঁর মাথায় পরিয়ে দিল ও তাঁকে এই বলে অভিনন্দন জানাতে লাগল,
‘প্রণাম, ইহুদীরাজ!’
 ➪ আর তারা একটা নলডাঁটা দিয়ে তাঁর মাথায় মারতে লাগল, তাঁর গায়ে থুথু দিল, ও হাঁটু পেতে তাঁর সামনে প্রণিপাত করল। তাঁকে এইভাবে বিদ্রূপ করার পর বেগুনি রঙের পোশাকটা খুলে ফেলে তারা তাঁর নিজের পোশাক তাঁকে পরিয়ে দিল ও ক্রুশে দেবার জন্য তাঁকে বাইরে নিয়ে গেল।
তখন সিমোন নামে কিরেনের একজন লোক খোলা মাঠ থেকে সেই পথ দিয়ে আসছিল—সে আলেক্সান্দার ও রূফুসের পিতা,—তাকেই তারা যিশুর ক্রুশ বয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য করল। পরে তারা তাঁকে গলগথা নামে স্থানে নিয়ে গেল; এই নামের অর্থ খুলিতলা; তারা তাঁকে গন্ধনির্যাস-মেশানো আঙুররস দিতে চাইল, তিনি কিন্তু তা নিলেন না।

[যিশুকে ক্রুশে দেওয়া হয়]

পরে তারা তাঁকে ক্রুশে দিল ও তাঁর জামাকাপড় ভাগ করে নিল: কে কি পাবে, তা গুলিবাঁট করেই স্থির করল। তারা যখন তাঁকে ক্রুশে দিল, সময় তখন সকাল ন’টা। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের লিপিটা এ ছিল: ইহুদীদের রাজা। তারা তাঁর সঙ্গে দু’জন দস্যুকে ক্রুশে দিল, একজনকে তাঁর ডান পাশে, আর একজনকে তাঁর বাঁ পাশে।
আর যে সকল লোক সেই পথ দিয়ে যাতায়াত করছিল, তারা মাথা নেড়ে তাঁকে টিটকারি দিয়ে বলছিল,
‘তুমি যে পবিত্রধামটা ভেঙে ফেল ও তিন দিনের মধ্যে গেঁথে তোল, ক্রুশ থেকে নেমে এসে নিজেকে ত্রাণ কর।’
 ➪ শাস্ত্রীদের সঙ্গে প্রধান যাজকেরাও নিজেদের মধ্যে তাঁকে এভাবে বিদ্রূপ করছিলেন, তাঁরা বলছিলেন,
‘সে অপরকে ত্রাণ করেছে, নিজেকে ত্রাণ করতে সক্ষম নয়! খ্রিষ্ট, ইস্রায়েলের রাজা, এখন ক্রুশ থেকে নেমে এসো, যেন তা দেখে আমরা বিশ্বাস করি।’
 ➪ এবং তাঁর সঙ্গে যাদের ক্রুশে দেওয়া হয়েছিল, তারাও তাঁকে অপমান করছিল। বেলা বারোটা থেকে বেলা তিনটে পর্যন্ত সারা পৃথিবী জুড়ে অন্ধকার হয়ে রইল; আর বেলা তিনটের সময়ে যিশু এই বলে জোর গলায় চিৎকার করলেন,
‘এলোই, এলোই, লামা শাবাখ্থানি?’
 ➪ তার অর্থ,
‘ঈশ্বর আমার, ঈশ্বর আমার, আমায় ত্যাগ করেছ কেন?’
 ➪ যারা কাছে দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের মধ্যে কেউ কেউ সেকথা শুনে বলল,
‘দেখ, সে এলিয়কে ডাকছে।’
 ➪ তখন একজন ছুটে গিয়ে একটা স্পঞ্জ সির্কায় ভিজিয়ে দিয়ে তা একটা নলডাঁটার আগায় লাগিয়ে তাঁকে পান করতে দিয়ে বলল,
‘দাঁড়াও, দেখি, এলিয় তাকে নামাতে আসেন কিনা।’
 ➪ কিন্তু যিশু তীব্র চিৎকার দিয়ে আত্মা বিসর্জন দিলেন।

[এই সময়ে সকলে নতজানু হয়ে কিছুক্ষণ নীরব থাকবে]

তখন পবিত্রধামের পরদাটা উপর থেকে নীচ পর্যন্ত ছিঁড়ে গিয়ে দু’ভাগ হল। আর যে শতপতি তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি যখন দেখলেন যিশু কেমন করে প্রাণত্যাগ করলেন, তখন বললেন,
‘ইনি সত্যিই ঈশ্বরের পুত্র ছিলেন!’
 ➪ কয়েকজন স্ত্রীলোকও দূরে থেকে দেখছিলেন: তাঁদের মধ্যে ছিলেন মাগদালার মারীয়া, ছোট যাকোবের ও যোসেসের মা মারীয়া, এবং সালোমে; যখন তিনি গালিলেয়ায় ছিলেন, তখন তাঁরা তাঁর অনুসরণ করে তাঁর সেবা করতেন। আরও বহু স্ত্রীলোক সেখানে ছিলেন, যাঁরা তাঁর সঙ্গে যেরুসালেমে এসেছিলেন।
পরে, সন্ধ্যা হলে, সেই দিনটি প্রস্তুতি-দিবস অর্থাৎ সাব্বাৎ দিনের আগের দিন হওয়ায় আরিমাথেয়ার সেই যোসেফ এলেন, যিনি মহাসভার গণ্যমান্য সদস্য; তিনি নিজেও ঈশ্বরের রাজ্যের প্রতীক্ষায় ছিলেন। তিনি সাহসের সঙ্গে পিলাতের কাছে গিয়ে যিশুর দেহ চাইলেন। যিশু যে এত শীঘ্রই মারা গেছেন, এতে পিলাত আশ্চর্য হলেন, এবং সেই শতপতিকে ডাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি এর মধ্যে মারা গেছেন কিনা। শতপতির কাছ থেকে কথাটা নিশ্চিত বলে জেনে তিনি যোসেফকে দেহটি দিলেন; আর তিনি একটা চাদর কিনে তাঁকে নামিয়ে ওই চাদরে জড়ালেন ও পাথরের গায়ে কাটা একটা সমাধিগুহার মধ্যে রাখলেন; পরে সমাধিগুহার মুখে একটা পাথর গড়িয়ে দিলেন। তাঁকে যে স্থানে রাখা হচ্ছিল, তা মাগদালার মারীয়া ও যোসেসের মা মারীয়া লক্ষ করলেন।

প্রভুর বাণী।

১৪। উপদেশ
যোহন-রচিত সুসমাচারে বিশপ সাধু আগস্তিনের ব্যাখ্যা

পর্ব উপলক্ষে যে বহু লোক এসেছিল, তারা যখন শুনল, যিশু যেরুসালেমের দিকে আসছেন, তখন খেজুর পাতা নিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে বেরিয়ে গেল। তারা চিৎকার করে বলছিল, হোসান্না; যিনি প্রভুর নামে আসছেন, যিনি ইস্রায়েলের রাজা, তিনি ধন্য (যোহন ১২:১২-১৩)।
জয়ের প্রতীক বলে খেজুর পাতা হল প্রশংসামূলক নৈবেদ্য: বস্তুত প্রভু আপন মৃত্যুতে মৃত্যুকে জয় করতে যাচ্ছিলেন; ক্রুশ-জয়চিহ্নে মৃত্যুর অধিপতির উপরে জয়লাভ করতে যাচ্ছিলেন। যিনি প্রভুর নামে আসছেন, অর্থাৎ যিনি পিতা ঈশ্বরের নামে আসছেন, যিনি ইস্রায়েলের রাজা, তিনি ধন্য,—যদিও ‘প্রভুর নামে’ বলতে ‘তাঁর নিজের নামে’ও বোঝাতে পারে, কারণ তিনি নিজে প্রভু। তবু তাঁর বাণী শ্রেয়তর উপলব্ধির দিকে আমাদের মন চালিত করে: আমি আমার পিতার নামে এসেছি, আর তোমরা আমাকে গ্রহণ কর না; নিজের নামে অন্য কেউ এলে, তোমরা তাকে গ্রহণ করতে (যোহন ৫:৪৩)।
সুতরাং খ্রিষ্ট বিনম্রতার গুরু, কেননা তিনি নিজেকে নমিত করলেন ও মৃত্যু পর্যন্ত, এমনকি ক্রুশ-মৃত্যু পর্যন্তই নিজেকে বাধ্য করলেন (ফিলি ২:৮)। তিনি যখন আমাদের কাছে বিনম্রতা শেখান, তখন নিজের ঈশ্বরত্বকে হারান না বটে: ঈশ্বরত্বে তিনি পিতার সমতুল্য, বিনম্রতায় আমাদের সদৃশ; পিতার সমতুল্য হওয়ায় তিনি আমাদের সৃষ্টি করলেন আমরা যেন জীবন পাই; আমাদের সদৃশ হওয়ায় আমাদের মুক্তিদান করলেন আমাদের যেন বিনাশ না হয়।
জনতা তাঁকে এভাবে বন্দনা করত, হোসান্না! যিনি প্রভুর নামে আসছেন, যিনি ইস্রায়েলের রাজা, তিনি ধন্য (যোহন ১২:১৩)। সেই বিপুল জনতা খ্রিষ্টকে আপন রাজা বলে ঘোষণা করতে দে’খে ইহুদী নেতাদের কী জ্বালা!
তবু প্রভুর পক্ষে ইস্রায়েলের রাজা হওয়ার অর্থ কী ছিল? সর্বযুগের রাজার পক্ষে মানুষের রাজা হওয়ায় মহান কী আছে? খ্রিষ্ট তো কর আদায় করার জন্য, এক সেনাদল যোগাড় করার জন্য, বা শত্রুদের বাহ্যিক ভাবে সংগ্রাম করার জন্য রাজা ছিলেন না। বরং আত্মাদের সুস্থির ও চিরকালের মত রক্ষা করার জন্য, ও যারা বিশ্বাস, আশা ও প্রেম করে, তাদের সকলকে স্বর্গে নিয়ে যাবার জন্যই রাজা। যিনি পিতার সমতুল্য ঈশ্বরপুত্র, যিনি নিজেই সেই বাণী যাঁর দ্বারা সবকিছু অস্তিত্ব পেল, তিনি যে ইস্রায়েলের রাজা হতে চাইলেন, তাঁর পক্ষে তা গৌরবোন্নয়ন নয়, বরং তাঁর প্রসন্নতার প্রমাণ; ক্ষমতা-বৃদ্ধি নয়, বরং দয়ারই চিহ্ন। কেননা পৃথিবীতে যাঁকে ইহুদীরাজ বলে অভিহিত করা হল, তিনি স্বর্গে দূতদের প্রভু।
যিশু একটা গাধার বাচ্চা খুঁজে পেয়ে তার পিঠে আসন নিলেন, যেমনটি লেখা আছে, সিয়োন-কন্যা, ভয় করো না: দেখ, তোমার রাজা আসছেন; তিনি গাধীর একটা বাচ্চার পিঠে আসীন (যোহন ১২:১৪-১৫)। এই যে সিয়োন-কন্যা যাকে উদ্দেশ্য করে এ দিব্য অনুপ্রাণিত বাণী উচ্চারিত, সে সেই মেষগুলির একটা মেষ যেগুলি পালকের কণ্ঠ শুনছিল; আবার সে সেই জনতা স্বরূপ, যে জনতা ভক্তিভরে জয়ধ্বনি তুলতে তুলতে আগমনকারী প্রভুর পিছে পিছে চলছিল। তাকেই নবী বলেন, ভয় করো না; তাঁকেই চিনে নাও যাঁর বন্দনা করছ; যখন তাঁকে যন্ত্রণাভোগ করতে দেখবে, তখন ভয় করো না, কেননা তখনই সেই রক্ত পাতিত হবে যার গুণে তোমার সমস্ত অপরাধ মুছে দেওয়া হবে ও তোমাকে জীবন দান করা হবে।

১৫। স্বর্গমর্তের স্রষ্টা
১৬। সার্বজনীন প্রার্থনা
১৭। অর্থদান

১৮। প্রভুর প্রার্থনা
অনুষ্ঠাতা:
ঐশশিক্ষায় উদ্দীপিত হয়ে, এসো,
ত্রাণকর্তার নির্দেশবাণী-মতো সাহসভরে বলি: হে আমাদের স্বর্গস্থ পিতঃ (ইত্যাদি)

অনুষ্ঠাতা:
হে প্রেমময় পিতা, সকল অমঙ্গল হতে আমাদের রক্ষা কর,
পৃথিবীতে শান্তি প্রদান কর,
পাপ থেকে মুক্ত হয়ে
আমরা যেন তোমার শান্তির পথে চালিত হই।
এই ভরসায় আমরা মুক্তিদাতা খ্রিষ্টের আগমনের প্রতীক্ষায় আছি।
সকলে:
যুগ যুগ ধরে তুমিই প্রভু, তুমিই শক্তিমান, তুমিই মহান।

অনুষ্ঠাতা:
হে প্রভু যিশুখ্রিষ্ট,
তুমি তোমার শিষ্যদের বলেছ,
আমি তোমাদের কাছে শান্তি রেখে যাচ্ছি,
আমারই শান্তি তোমাদের দান করছি।
মিনতি করি, হে প্রভু,
আমাদের পাপের প্রতি দৃষ্টিপাত না করে
তোমার মণ্ডলীর বিশ্বাসের প্রতি দৃষ্টিপাত কর।
তোমার মণ্ডলীেক শান্তি ও একতা দান কর।
হে খ্রিষ্ট, যুগ যুগ ধরে তুমিই বিরাজমান, তুমিই প্রভু।
সকলে:
আমেন।

অনুষ্ঠাতা:
এসো, একে অপরকে শান্তির চিহ্ন প্রদান করি।

হে বিশ্বপাপহর (ইত্যাদি)

১৯। প্রভুকে গ্রহণ
পুরোহিত না থাকায় ভক্তগণ পবিত্র রুটি-ছাড়া অর্থাৎ আধ্যাত্মিক ভাবে প্রভুকে গ্রহণ করতে পারেন।
হে প্রভু, তোমাকে গ্রহণ করতে আমি অযোগ্য;
কিন্তু বিশ্বাস করি, তোমার বাক্যেই আমি মুক্তি পাব।

২০। ধ্যান-গীতি: সাম ২৩
ধুয়ো:
পিতা, আমি পান না করলে এ পাত্র যদি সরে যেতে না পারে,
তবে তোমার ইচ্ছা পূর্ণ হোক।

প্রভু আমার পালক;
অভাব নেই তো আমার;
আমায় তিনি শুইয়ে রাখেন নবীন ঘাসের চারণমাঠে,
আমায় নিয়ে যান শান্ত জলের কূলে;   [ধুয়ো]

তিনি সঞ্জীবিত করেন আমার প্রাণ,
তাঁর নামের খাতিরে আমায় চালনা করেন ধর্মপথে।
মৃত্যু-ছায়ার উপত্যকাও যদি পেরিয়ে যাই,
আমি কোন অনিষ্টের ভয় করি না, তুমি যে আমার সঙ্গে আছ।   [ধুয়ো]

তোমার যষ্টি, তোমার পাচনি আমাকে সান্ত্বনা দেয়।
আমার সম্মুখে তুমি সাজাও ভোজনপাট আমার শত্রুদের সামনে;
আমার মাথা তুমি তৈলসিক্ত কর;
আমার পানপাত্র উচ্ছলিত।   [ধুয়ো]

মঙ্গল ও কৃপাই হবে আমার সহচর
আমার জীবনের সমস্ত দিন ধরে,
আমি প্রভুর গৃহে ফিরব—চিরদিনের মত!
ত্রিত্বের গৌরব হোক চিরকালের মত। আমেন।   [ধুয়ো]

২১। শেষ প্রার্থনা: এসো, প্রার্থনা করি।
হে প্রভু, তোমার পবিত্র উপহারে পরিতৃপ্ত হয়ে উঠে আমরা মিনতি জানাই:
আমরা যা বিশ্বাস করি, তুমি যখন তোমার পুত্রের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে
তা পাবার আশা আমাদের দিয়েছ, তখন আমরা যে দিকে ধাবিত,
তাঁর পুনরুত্থানের খাতিরে সেইখানে আমাদের চালনা কর।
আমাদের প্রভু সেই খ্রিষ্টের দ্বারা।
সকলে: আমেন।

২২। বিদায়
অনুষ্ঠাতা:
পিতা ও পুত্র ও পবিত্র আত্মা আমাদের সকলকে আশীর্বাদ করুন।
সকলে: আমেন।

অনুষ্ঠাতা:
শান্তিতে যাও; নিজেদের জীবনাচরণে প্রভুকে গৌরবান্বিত কর।
সকলে: ঈশ্বরকে ধন্যবাদ।

[সূচী]    


প্রভুর সান্ধ্যভোজ বৃহস্পতিবার - সান্ধ্য অনুষ্ঠান
আমি তোমাদের প্রতি যা করলাম,
তোমরা কি তা বুঝতে পার?
আমি যখন তোমাদের পা ধুয়ে দিলাম,
তখন তোমাদেরও পরস্পরের পা ধুয়ে দেওয়া উচিত।
আমি তোমাদের জন্য যেমনটি করলাম,
তোমরাও তেমনটি কর (যোহন ১৩:১২-১৫)।
১। সূচনা [অনুষ্ঠাতা ও ভক্তগণ]
পিতা ও পুত্র ও পবিত্র আত্মার নামে।
    - আমেন।

আমাদের প্রভু যিশুখ্রিষ্টের অনুগ্রহ,
পিতা ঈশ্বরের প্রেম,
এবং পবিত্র আত্মার প্রেরণা
তোমাদের মধ্যে বিরাজ করুক।
    - আপনার মধ্যেও বিরাজ করুক।

এসো, এ পবিত্র অনুষ্ঠানে যোগ্যরূপে অংশ নেবার জন্য আমাদের পাপ স্বীকার করি।
হে প্রভু, আমাদের প্রতি দয়া কর।
    - তোমার বিরুদ্ধে যে করেছি পাপ।
আমাদের দেখাও, প্রভু, তোমার কৃপা।
    - আমাদের দাও গো তোমার পরিত্রাণ।
সর্বশক্তিমান ঈশ্বর আমাদের প্রতি দয়া করুন, এবং আমাদের পাপ ক্ষমা করে অনন্ত জীবনে নিয়ে যান।
    - আমেন।
প্রভু, দয়া কর।
    - প্রভু, দয়া কর।
খ্রিষ্ট, দয়া কর
    - খ্রিষ্ট, দয়া কর।
প্রভু, দয়া কর।
    - প্রভু, দয়া কর।

২। জয় পরমেশ্বর। স্তোত্রটি গানের সময়ে ঘণ্টাগুলো বাজানো হয়, আর গান শেষে ঘন্টাগুলো পাস্কা জাগরণীর জয় পরমেশ্বর পর্যন্ত নীরব থাকবে। একই প্রকারে, এ একই সময় ধরে বাদ্যযন্ত্রগুলো কেবল গায়কদের সহায়তার জন্যই ব্যবহার করা যেতে পারে।

৩। সমাবেশ প্রার্থনা: এসো, প্রার্থনা করি।
মৃত্যুর হাতে নিজেকে সঁপে দিতে গিয়ে
তোমার একমাত্র পুত্র যে পবিত্রতম ভোজে মণ্ডলীর কাছে চিরকালের মতই অভিনব এক যজ্ঞ,
নিজের ভালবাসার এ ভোজসভাই সম্প্রদান করেছেন,
হে ঈশ্বর, সেই ভোজে অংশ নিতে চলেছে যারা,
সেই আমরা যেন তোমার আশীর্বাদে তেমন মহান রহস্যে যোগদানের ফলে
ঐশপ্রেমের ও জীবনের পূর্ণতা লাভ করতে পারি।
পবিত্র আত্মার ঐক্যে, তোমার সঙ্গে, বিশ্বরাজ ও জীবনেশ্বর রূপে যুগে যুগে বিরাজমান তোমার পুত্র আমাদের প্রভু সেই যিশুখ্রিষ্টের দ্বারা।
সকলে: আমেন।

৪। প্রথম পাঠ
যাত্রাপুস্তক থেকে পাঠ (১২:১-৮,১১-১৪)

একদিন, মিশর দেশে প্রভু মোশি ও আরোনকে বললেন, ‘এই মাস তোমাদের কাছে হবে সমস্ত মাসের আদি মাস, তোমাদের কাছে হবে বছরের প্রথম মাস। তোমরা গোটা ইস্রায়েল জনমণ্ডলীর কাছে কথা বল; তাদের বল, এই মাসের দশম দিনে প্রত্যেকে এক একটা পরিবারের জন্য, এক একটা ঘরের জন্য একটা করে শাবক যোগাড় করে নেবে। গোটা শাবকটাকে খাওয়ার পক্ষে যদি পরিবার বেশি ছোট হয়, তবে সেই পরিবার লোকসংখ্যা অনুসারে তার সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশীর সঙ্গে যোগ দেবে। কে কতটা খেতে পারে, সেই হিসাবেই তোমরা উপযুক্ত শাবক বেছে নেবে।
শাবকটাকে খুঁতবিহীন হতে হবে, হতে হবে এক বছরের একটা পুংশাবক। তোমরা মেষপালের বা ছাগপালের মধ্য থেকে তা বেছে নিতে পারবে, আর এই মাসের চতুর্দশ দিন পর্যন্ত তা বাঁচিয়ে রাখবে; তখনই ইস্রায়েল জনমণ্ডলীর গোটা জনসমাবেশ সন্ধ্যাবেলায় সেই শাবক জবাই করবে। তার একটু রক্ত নিয়ে, যে সব ঘরে শাবকটাকে খাওয়া হয়, তার দরজার দুই বাজুতে ও কপালিতে তা লেপে দেওয়া হবে। সেই রাতেই তার মাংস খেতে হবে: আগুনে ঝলসে নিয়ে খামিরবিহীন রুটি ও তেতো শাকের সঙ্গে তা খেতে হবে। তোমরা তা এইভাবে খাবে: কোমরে বন্ধনী বাঁধা থাকবে, পায়ে থাকবে জুতো, হাতে লাঠি; আর তাড়াতাড়িই তা খেতে হবে। এ প্রভুর উদ্দেশে পাস্কা!
সেই রাতে আমি মিশর দেশের মধ্য দিয়ে যাব, এবং মিশর দেশে মানুষ ও পশুর সমস্ত প্রথমজাতকের উপরে মারণ-আঘাত হানব; আমি মিশরের সমস্ত দেবতার যোগ্য দণ্ড দেব: আমিই প্রভু। যে সব বাড়িতে তোমরা থাক, তাতে লাগানো রক্তই হবে তোমাদের পক্ষে চিহ্নস্বরূপ: সেই রক্ত দেখে আমি তোমাদের ছেড়ে এগিয়ে যাব, আর আমি যখন মিশর দেশ আঘাত করব, তখন সংহারক আঘাত তোমাদের উপরে পড়বে না।
এই দিনটি তোমাদের কাছে এক স্মরণদিবস হয়ে দাঁড়াবে: তোমরা এই দিনটিকে প্রভুর উদ্দেশে উৎসব বলে পালন করবে, পুরুষানুক্রমে চিরস্থায়ী বিধিরূপেই তা পালন করবে।’
ঈশ্বরের বাণী।

৫। সামসঙ্গীত ১১৬
ধুয়ো:
স্তুতিবাদের সেই পানপাত্র,
তা খ্রিষ্টের রক্তে সহভাগিতা।

আমার প্রতি প্রভুর সমস্ত উপকারের জন্য
প্রতিদানে আমি তাঁকে কী দিতে পারব?
পরিত্রাণের পানপাত্র তুলে ধরে
আমি করব প্রভুর নাম।   [ধুয়ো]

প্রভুর দৃষ্টিতে মূল্যবান
তাঁর ভক্তদের মৃত্যু।
আমি তোমারই দাস, তোমার দাসীর পুত্র,
তুমি খুলে দিয়েছ আমার শৃঙ্খল।   [ধুয়ো]

তোমার উদ্দেশে ধন্যবাদ-বলি উৎসর্গ ক’রে
আমি করব প্রভুর নাম।
প্রভুর উদ্দেশে আমার ব্রতসকল উদ্‌যাপন করব
তাঁর সমস্ত জনগণের সামনে।   [ধুয়ো]

৬। দ্বিতীয় পাঠ
প্রেরিতদূত সাধু পলের প্রথম পত্র থেকে পাঠ (১১:২৩-২৬)

প্রিয়জনেরা, আমি প্রভুর কাছ থেকে এই শিক্ষা পেয়েছি, এই শিক্ষা তোমাদের কাছে সম্প্রদানও করেছি যে: যে রাত্রিতে প্রভু যিশুর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছিল, সেই রাত্রিতে তিনি একখানা রুটি গ্রহণ করে নিলেন; এবং ধন্যবাদ-স্তুতি উচ্চারণ করে তা ছিঁড়ে বললেন: ‘এ আমার দেহ, যা তোমাদেরই জন্য; তোমরা আমার স্মরণার্থে তেমনটি কর।’
ভোজনের শেষে তিনি তেমনটি করেই পানপাত্রটি তাঁদের দিয়ে বললেন: ‘এই পানপাত্র আমার রক্তে স্থাপিত নবসন্ধি। যতবার এই পানপাত্র থেকে পান কর, ততবার তোমরা আমার স্মরণার্থে তেমনটি কর।’
কারণ যতবার তোমরা এই রুটি খাও ও এই পানপাত্র থেকে পান কর, ততবার তোমরা তো প্রভুর মৃত্যু ঘোষণা কর, যতদিন না তিনি আসেন।
ঈশ্বরের বাণী।

৭। সুসমাচার বরণ-গীতি
হে খ্রিষ্ট প্রভু, গৌরব, প্রশংসা ও সম্মানের যোগ্য তুমি।
এক নতুন আজ্ঞা তোমাদের দিচ্ছি
—একথা বলছেন প্রভু:
আমি যেমন তোমাদের ভালবেসেছি,
তেমনি তোমরাও পরস্পরকে ভালবাস।
হে খ্রিষ্ট প্রভু, গৌরব, প্রশংসা ও সম্মানের যোগ্য তুমি।

৮। সুসমাচার
যোহন-রচিত বিত্র সুসমাচার থেকে পাঠ (১৩:১-১৫)

পাস্কাপর্বের আগে, এই জগৎ থেকে পিতার কাছে চলে যাওয়ার ক্ষণ উপস্থিত হয়েছে জেনে, যিশু, তাঁর যে আপনজনেরা এই জগতে ছিলেন, তাঁদের অবিরতই ভালবেসে শেষ পর্যন্তই তাঁদের ভালবেসে গেলেন। সান্ধ্যভোজ তখন চলছে; দিয়াবল ইতিমধ্যে সিমোনের ছেলে যুদা ইস্কারিয়োতের হৃদয়ে তাঁর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করার সঙ্কল্প প্রবেশ করিয়েছিল।
একথা জেনে যে, পিতা তাঁরই হাতে সমস্তই তুলে দিয়েছেন, এবং তিনি যে ঈশ্বরের কাছ থেকে এসেছেন আর ঈশ্বরের কাছে ফিরে যাচ্ছেন এও জেনে, যিশু ভোজ থেকে উঠলেন, জামা খুলে রাখলেন, এবং একটা গামছা নিয়ে তা কোমরে জড়ালেন; তারপর একটা পাত্রে জল ঢেলে শিষ্যদের পা ধুয়ে দিতে শুরু করলেন, আর কোমরের গামছা দিয়ে তা মুছে দিতে লাগলেন।
তিনি সিমোন পিতরের কাছে এলেন, আর ইনি তাঁকে বললেন, ‘প্রভু, আপনি কি আমার পা ধুতে যাচ্ছেন?’ যিশু তাঁকে উত্তর দিলেন, ‘আমি যা করছি, তা তুমি এখন জান না, কিন্তু পরে বুঝতে পারবে।’ পিতর তাঁকে বললেন, ‘আপনি আমার পা কখনও ধুয়ে দেবেন না!’ যিশু তাঁকে উত্তর দিলেন, ‘আমি তোমাকে ধৌত না করলে আমার সঙ্গে তোমার কোন অংশ নেই।’ সিমোন পিতর বললেন, ‘প্রভু, আমার পা শুধু নয়, হাত ও মাথাও ধুয়ে দিন।’ যিশু তাঁকে বললেন, ‘যে স্নান করেছে, তার ধৌত হওয়ার আর প্রয়োজন নেই, সে সর্বাঙ্গেই শুদ্ধ। তোমরা তো শুদ্ধ, তবু সকলে নও।’ কেননা তিনি জানতেন, কে তাঁর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করবেন; এজন্যই তিনি বললেন, ‘তোমরা সকলে শুদ্ধ নও।’
তাঁদের পা ধুয়ে দেবার পর, নিজের জামা পরে আবার আসন নেবার পর তিনি তাঁদের বললেন, ‘আমি তোমাদের প্রতি যা করলাম, তোমরা কি তা বুঝতে পার? তোমরা আমাকে গুরু ও প্রভু বলে ডাক, আর ঠিকই বল, কারণ আমি তা-ই। তবে, প্রভু ও গুরু হয়ে আমি যখন তোমাদের পা ধুয়ে দিলাম, তখন তোমাদেরও পরস্পরের পা ধুয়ে দেওয়া উচিত। আমি তোমাদের একটা আদর্শ দিলাম, আমি তোমাদের জন্য যেমনটি করলাম, তোমরাও যেন তেমনটি কর।’
প্রভুর বাণী।

৯। উপদেশ
সার্দিসের বিশপ মেলিতনের ‘পাস্কা উপদেশ’

নবীদের দ্বারা অনেক ভবিষ্যদ্বাণী দেওয়া হয়েছে সেই পাস্কা-রহস্য সম্বন্ধে যে রহস্য স্বয়ং খ্রিষ্ট: তাঁর গৌরব হোক যুগে যুগে চিরকাল। আমেন (গা ১:৫)। তিনি যন্ত্রণাভোগী মানুষের জন্য স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে এলেন; কুমারীর গর্ভে সেই মানবস্বরূপকে পরিধান করে তিনি মানুষ হয়ে বেরিয়ে এলেন; যন্ত্রণা-সাপেক্ষ দেহের মধ্য দিয়ে যন্ত্রণাভোগী মানুষের যন্ত্রণা বরণ করে নিয়ে দৈহিক যন্ত্রণাদায়ী রিপু বিনাশ করলেন, ও অমর আত্মা দ্বারা খুনী মৃত্যুকে খুন করলেন। বস্তুত তিনি মেষশাবকের মত চালিত হলেন ও মেষের মত নিহত হলেন; সংসারের জীবনধারণ থেকে, যেন মিশর থেকেই, আমাদের মুক্ত করলেন, ও শয়তানের দাসত্ব থেকে, যেন ফারাওর হাত থেকেই, আমাদের উদ্ধার করলেন; আপন আত্মায় আমাদের আত্মাকে, ও আপন রক্তে আমাদের দেহের অঙ্গগুলিকে চিহ্নিত করলেন।
ইনিই মৃত্যুকে দিশেহারা করে দিলেন ও দিয়াবলকে কান্নায় নিক্ষেপ করলেন, যেমন মোশি ফারাওকে কান্নায় নিক্ষেপ করেছিলেন। ইনিই অধর্ম আঘাত করলেন ও অধর্মময়তাকে অনুর্বরতায় দণ্ডিত করলেন, যেমন মোশি করেছিলেন মিশরের বেলায়।
ইনিই দাসত্ব থেকে মুক্তিতে, অন্ধকার থেকে আলোয়, মৃত্যু থেকে জীবনে, স্বৈরশাসন থেকে শাশ্বত রাজ্যে আমাদের বের করে আনলেন ও আমাদের করে তুললেন নতুন যাজকত্ব ও মনোনীত ও চিরকালীন জনগণ। ইনিই আমাদের পরিত্রাণের পাস্কা-বলি।
ইনিই সকলের বোঝা বরণ করে নিলেন; ইনিই হলেন আবেলে নিহত, ইসায়াকে শেকলাবদ্ধ, যাকোবে প্রবাসী, যোসেফে বিক্রীত, মোশিতে জলে সমর্পিত, দাউদে নির্যাতিত ও সকল নবীতে অপমানিত।
ইনিই হলেন কুমারীতে দেহধারী, ক্রুশে ঝুলানো ও মাটিতে সমাহিত; তৃতীয় দিনে মৃত্যু থেকে পুনরুত্থান করে তিনি স্বর্গের ঊর্ধ্বে আরোহণ করলেন।
ইনি নীরব সেই মেষশাবক, নিহতই সেই মেষশাবক যিনি সুন্দরী মেষিকা সেই মারীয়া থেকে সঞ্জাত; ইনিই সেই মেষশাবক যিনি পাল থেকে উপনীত, জবাইখানায় চালিত, সন্ধ্যায় বলীকৃত ও রাত্রিতে সমাহিত হলেন: হ্যাঁ, ইনি সেই মেষশাবক ক্রুশবৃক্ষের উপরে যাঁর কোন হাড় ভেঙে দেওয়া হয়নি, মাটিগর্ভে যাঁর ক্ষয় হয়নি, যিনি মৃতদের মধ্য থেকে পুনরুত্থান করলেন ও পাতাল-সমাধি থেকে মানুষকে পুনরুত্থিত করলেন।

১০। পাদপ্রক্ষালন
অনুষ্ঠাতা এক একজনের পায়ে জল ঢেলে পা মুছে দেন।
১১। এসময় নিচের ধুয়োগুলো গাওয়া যেতে পারে:
ভোজ থেকে ওঠার পর
প্রভু একটা পাত্রে জল ঢেলে
তাঁর শিষ্যদের পা ধুয়ে দিতে শুরু করলেন:
তিনি তাঁদের কাছে একটি আদর্শ রেখে গেলেন।

আপন শিষ্যদের সঙ্গে ভোজন করার পর
প্রভু যিশু তাঁদের পা ধুয়ে দিয়ে তাঁদের বললেন:
প্রভু ও গুরু হয়ে আমি তোমাদের প্রতি যা করলাম, তোমরা কি তা বুঝতে পার?
আমি তোমাদের একটি আদর্শ দিলাম, তোমরাও যেন তেমনটি কর।

প্রভু, আপনি কি আমার পা ধুতে যাচ্ছেন?
উত্তরে যিশু বললেন:
আমি তোমার পা ধুয়ে না দিলে
আমার সঙ্গে তোমার কোন অংশ নেই।

১২। বিশ্বাস-সূত্র বলা হয় না।

১৩। অর্থদান অর্থদানের সময়ে নিচের ধুয়ো গান করা যেতে পারে।
ধুয়ো: যেখানে রয়েছে প্রকৃত ভালবাসা,
সেইখানে ঈশ্বর উপস্থিত।

আমাদের একত্রে মিলিত করেছে খ্রিষ্টের প্রেম:
এসো, সেই খ্রিষ্টে আনন্দে মেতে উঠি,
এসো, জীবনময় ঈশ্বরকে সম্ভ্রম ও ভক্তি করি,
এসো, অকৃত্রিম প্রেমে একে অপরকে ভালবাসি।   [ধুয়ো]

তাই আমরা সবাই একদেহে সম্মিলিত হলে
নিজেদের মধ্যে বিচ্ছিন্ন না হতে চেষ্টা করি যেন,
শেষ হয়ে যাক যত হিংসা-বিবাদ,
আমাদের মাঝে বিরাজ করুন খ্রিষ্ট ঈশ্বর।[ধুয়ো]

আমরা একদিন সগৌরবে সাধুসাধ্বীর সঙ্গে এক হয়ে
যেন তোমার শ্রীমুখের দর্শন পেতে পারি, খ্রিষ্ট ঈশ্বর:
সেটিই এমন আনন্দ যা অসীম যা মঙ্গলময়,
যা বিরাজ করবে যুগে যুগে চিরকাল ধরে। আমেন।[ধুয়ো]

১৪। প্রভুর প্রার্থনা
অনুষ্ঠাতা:
ঐশশিক্ষায় উদ্দীপিত হয়ে, এসো,
ত্রাণকর্তার নির্দেশবাণী-মতো সাহসভরে বলি: হে আমাদের স্বর্গস্থ পিতঃ (ইত্যাদি)

অনুষ্ঠাতা:
হে প্রেমময় পিতা, সকল অমঙ্গল হতে আমাদের রক্ষা কর,
পৃথিবীতে শান্তি প্রদান কর,
পাপ থেকে মুক্ত হয়ে
আমরা যেন তোমার শান্তির পথে চালিত হই।
এই ভরসায় আমরা মুক্তিদাতা খ্রিষ্টের আগমনের প্রতীক্ষায় আছি।
সকলে:
যুগ যুগ ধরে তুমিই প্রভু, তুমিই শক্তিমান, তুমিই মহান।

অনুষ্ঠাতা:
হে প্রভু যিশুখ্রিষ্ট,
তুমি তোমার শিষ্যদের বলেছ,
আমি তোমাদের কাছে শান্তি রেখে যাচ্ছি,
আমারই শান্তি তোমাদের দান করছি।
মিনতি করি, হে প্রভু,
আমাদের পাপের প্রতি দৃষ্টিপাত না করে
তোমার মণ্ডলীর বিশ্বাসের প্রতি দৃষ্টিপাত কর।
তোমার মণ্ডলীেক শান্তি ও একতা দান কর।
হে খ্রিষ্ট, যুগ যুগ ধরে তুমিই বিরাজমান, তুমিই প্রভু।
সকলে:
আমেন।

অনুষ্ঠাতা:
এসো, একে অপরকে শান্তির চিহ্ন প্রদান করি।

হে বিশ্বপাপহর (ইত্যাদি)

১৫। প্রভুকে গ্রহণ
পুরোহিত না থাকায় ভক্তগণ পবিত্র রুটি-ছাড়া অর্থাৎ আধ্যাত্মিক ভাবে প্রভুকে গ্রহণ করতে পারেন।
হে প্রভুম তোমাকে গ্রহণ করতে আমি অযোগ্য;
কিন্তু বিশ্বাস করি, তোমার বাক্যেই আমি মুক্তি পাব।

১৬। ধ্যান-গীতি: সাম ১১৬
ধুয়ো:
এ আমার দেহ, যা তোমাদেরই জন্য,
এই পানপাত্র আমার রক্তে স্থাপিত নবসন্ধি—একথা বলছেন প্রভু;
যতবার এই পানপাত্র থেকে পান কর,
ততবার তোমরা আমার স্মরণার্থে তেমনটি কর।

আমি তখনও বিশ্বাস রেখেছি যখন বলতাম,
‘আমি অত্যন্ত দুর্দশাগ্রস্ত,’
বিহ্বল হয়ে আমি বলতাম,
‘সকল মানুষ মিথ্যাবাদী।’   [ধুয়ো]

আমার প্রতি প্রভুর সমস্ত উপকারের জন্য
প্রতিদানে আমি তাঁকে কী দিতে পারব?
পরিত্রাণের পানপাত্র তুলে ধরে
আমি করব প্রভুর নাম।   [ধুয়ো]

প্রভুর উদ্দেশে আমার ব্রতসকল উদ্‌যাপন করব
তাঁর সমস্ত জনগণের সামনে।
প্রভুর দৃষ্টিতে মূল্যবান
তাঁর ভক্তদের মৃত্যু।   [ধুয়ো]

দোহাই প্রভু! আমি তো তোমার দাস, †
আমি তোমারই দাস, তোমার দাসীর পুত্র,
তুমি খুলে দিয়েছ আমার শৃঙ্খল।
তোমার উদ্দেশে ধন্যবাদ-বলি উৎসর্গ ক’রে
আমি করব প্রভুর নাম।   [ধুয়ো]

প্রভুর উদ্দেশে আমার ব্রতসকল উদ্‌যাপন করব
তাঁর সমস্ত জনগণের সামনে,
প্রভুর গৃহের প্রাঙ্গণে,
হে যেরুসালেম, তোমারই অন্তঃস্থলে।   [ধুয়ো]

১৭। শেষ প্রার্থনা: এসো, প্রার্থনা করি।
হে সর্বশক্তিমান ঈশ্বর, আশীর্বাদ কর:
আমরা যেমন ইহলোকে তোমার পুত্রের ভোজে নব শক্তি লাভ করি, তেমনি যেন একদিন
তাঁর চিরকালীন ভোজসভায় যোগদান করে পরিতৃপ্ত হতে পারি।
বিশ্বরাজ ও জীবনেশ্বর রূপে তিনি যুগে যুগে বিরাজমান।
সকলে: আমেন।

এভাবেই অনুষ্ঠান সমাপ্ত।
সান্ধ্যভোজের পরে যিশু ১১৩–১১৮ নং সামসঙ্গীত গান করে প্রেরিতদূতদের সঙ্গে জৈতুন পর্বতের দিকে বেরিয়ে পড়েছিলেন। তাঁর সঙ্গী হয়ে খ্রিষ্টভক্তগণ আগামীকাল বিকাল পর্যন্ত এবিষয়ে ধ্যানমগ্ন থাকেন।
ঘরে কোনো বেদি (আসন) থাকলে তা থেকে সমস্ত কাপড় সরানো হয় এবং কোনো ক্রুশ থাকলে তা একটি আবরণ দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। সেইসঙ্গে, সম্ভব হলে, সমস্ত ধর্মীয় ছবিও পাস্কাপর্বের নিশিজাগরণী পর্যন্ত একটি আবরণ দিয়ে ঢেকে রাখা হয়।

[সূচী]    


প্রভুর যন্ত্রণাভোগ শুক্রবার - প্রভুর যন্ত্রণাভোগের স্মরণানুষ্ঠান
ক্রুশে বিদ্ধ প্রভু যিশু।
বেদি বা আসন সম্পূর্ণরূপে সাজ-সজ্জাহীন থাকবে: ক্রুশও নেই, বাতিও নেই, কোনও কাপড়ও নেই।
কাপড়ে ঢাকা ক্রুশটি ঘরের বাইরে বা অন্য রুমে রাখা হবে।
এদিনে বিকেলবেলায়, মোটামুটি তিনটে সময় (জরুরী কারণ হেতু দেরিতেও করা যেতে পারে) প্রভুর যন্ত্রণাভোগের স্মরণানুষ্ঠান সম্পাদিত হয় যা দু' ভাগে বিভক্ত, তথা: বাণী উপাসনা ও ক্রুশ আরাধনা।

সূচনা

ঘরে বেদি বা আসন থাকলে তবে ঘরের সকলে সেটির প্রতি সম্মান জানিয়ে ভূমিষ্ঠ হয়ে কিছুক্ষণ নীরব প্রার্থনা করেন।
তারপর অনুষ্ঠাতা বাহু প্রসারিত করে নিচের প্রার্থনা পাঠ করেন। ‘এসো, প্রার্থনা করি’ বলা হয় না।
১। প্রার্থনা
যাদের জন্য তোমার পুত্র সেই খ্রিষ্ট নিজের রক্তক্ষরণে
পাস্কা-রহস্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন,
তোমার কৃপাধারার কথা স্মরণ ক’রে, হে প্রভু,
তোমার সেই সেবকমণ্ডলীকে
তোমার চিরকালীন রক্ষায় পবিত্র করে তোল।
বিশ্বরাজ ও জীবনেশ্বর রূপে তিনি যুগে যুগে বিরাজমান।
সকলে: আমেন।
প্রথম ভাগ
বাণী উপাসনা
২। প্রথম পাঠ
নবী ইসাইয়ার পুস্তক থেকে পাঠ (৫২:১৩–৫৩:১২)

দেখ! আমার দাস কৃতকার্যই হবেন:
তিনি উন্নীত হবেন, উত্তোলিত হবেন, হবেন মহামহিম।
একদিন যেমন তাঁর জন্য বহু মানুষ শিহরে উঠেছিল,
—অন্য মানুষের তুলনায় তাঁর চেহারা এমনই বিকৃত ছিল যে,
আদমসন্তানদের সঙ্গে তাঁর আর কোন সাদৃশ্যই ছিল না—
একদিন তেমনি বহু দেশের মানুষ তাঁর বিষয়ে বিস্ময়মগ্ন হয়ে যাবে।
রাজারা তাঁর কারণে মুখ বন্ধ রাখবে,
কারণ তাদের কাছে যা কখনও বলা হয়নি, তারা তা দেখতে পাবে;
যা কখনও শোনেনি, তারা তা উপলব্ধি করবে।
আমাদের প্রচারে কে বিশ্বাস রেখেছে?
প্রভুর বাহু কার্‌ কাছে প্রকাশিত হয়েছে?
তিনি তো তাঁর সামনে বেড়ে উঠেছেন একটা চারাগাছের মত,
শুষ্ক ভূমিতে একটা শিকড়ের মত।
তাঁর এমন রূপ বা শোভা নেই যা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে;
তেমন আকৃতি নেই যা আমাদের মন জয় করতে পারে।
অবজ্ঞাত ও মানুষের পরিত্যক্ত,
এমন কষ্টভোগী মানুষ যন্ত্রণার সঙ্গে যাঁর দীর্ঘ পরিচয়;
যার সামনে লোকে মুখ আচ্ছাদন করে
তেমন মানুষের মতই তিনি অবজ্ঞাত হলেন,
আর আমরা তাঁকে কোন সম্মানই দিইনি।
অথচ তিনি আমাদেরই যন্ত্রণা তুলে বহন করেছেন;
বরণ করে নিয়েছেন আমাদের যত কষ্ট;
আর আমরা নাকি মনে করছিলাম, তিনি প্রহারিত,
পরমেশ্বর দ্বারা আঘাতগ্রস্ত, জর্জরিত!
তিনি বরং আমাদেরই অন্যায়-অপকর্মের জন্য অপমানের পাত্র হয়েছেন;
আমাদের শঠতার জন্যই চূর্ণবিচূর্ণ হয়েছেন;
আমাদের শান্তির পণ সেই শাস্তি তাঁর উপরে নেমে পড়ল।
তাঁরই ক্ষতগুণে আমরা নিরাময় হলাম।
আমরা সকলে মেষপালের মত পথভ্রষ্ট ছিলাম,
প্রত্যেকে নিজ নিজ পথ ধরে চলতাম;
প্রভু আমাদের সকলের অপরাধ তাঁরই উপরে চেপে দিলেন।
অত্যাচারিত হয়ে তিনি দুঃখভোগ স্বীকার করলেন
—তবু খুললেন না মুখ।
তিনি ছিলেন জবাইখানায় চালিত মেষশাবকেরই মত,
লোমকাটিয়ের সামনে নীরব মেষেরই মত
—তবু খুললেন না মুখ।
বিচারিত হয়ে তাঁকে জোর প্রয়োগে নেওয়া হল;
তাঁর যুগের মানুষদের মধ্যে কে তাঁর দশায় শোক করল?
হ্যাঁ, তাঁকে জীবিতদের দেশ থেকে উচ্ছেদ করা হল,
তাঁর জনগণের শঠতার জন্যই তাঁর উপরে মৃত্যুর আঘাত নেমে পড়ল।
তাঁকে দুর্জনদের সঙ্গে সমাধি দেওয়া হল,
ধনবানের সঙ্গেই তাঁর কবর,
যদিও তিনি কোন অপকর্ম করেননি, যদিও তাঁর মুখেও ছলনা ছিল না।
প্রভুর মঙ্গল-ইচ্ছা ছিল, তিনি তাঁকে যন্ত্রণায় চূর্ণ করবেন;
যদি তিনি সংস্কার-বলিরূপে নিজেকে উৎসর্গ করেন,
তবে তাঁর আপন বংশকে দেখতে পাবেন, দীর্ঘায়ু হবেন,
ও তাঁর মধ্য দিয়ে প্রভুর মঙ্গল-ইচ্ছা সিদ্ধিলাভ করবে।
তেমন আন্তর পীড়ন ভোগ করার পর
তিনি জীবনের আলো দেখতে পেয়ে তৃপ্তি পাবেন;
মানুষ তাঁকে জানবে,
ফলে আমার ধর্মময় দাস অনেককে ধর্মময় করে তুলবেন;
তিনি নিজেই তাদের শঠতা বহন করবেন।
তাই আমি তাঁর জন্য বহু মানুষের সঙ্গে একটা অংশ স্থির করব,
ক্ষমতাশালীদের সঙ্গে তিনি লুটের মাল ভাগ করে নেবেন;
কেননা তিনি মৃত্যু পর্যন্তই নিজের প্রাণ উজাড় করে দিলেন,
এবং বিদ্রোহীদের একজন বলে গণ্য হলেন;
অথচ তিনি বহু মানুষের পাপ বহন করছিলেন
এবং বিদ্রোহীদের হয়ে প্রার্থনা করছিলেন।
ঈশ্বরের বাণী।

৩। সামসঙ্গীত ৩১
ধুয়ো:
পিতা, তোমার হাতে
আমার আত্মা তুলে দিই।

প্রভু, তোমাতেই নিয়েছি আশ্রয়, আমাকে যেন কখনও লজ্জা না পেতে হয়।
তোমার ধর্মময়তায় আমাকে রেহাই দাও।
তোমারই হাতে নিজেকে সঁপে দিই,
হে প্রভু, সত্যের ঈশ্বর, সাধন কর আমার মুক্তিকর্ম!   [ধুয়ো]

আমার সকল বিরোধীর কাছে আমি অপবাদের পাত্র,
প্রতিবেশীদের কাছে শঙ্কার বস্তু,
পরিচিতদের কাছে মহাবিভীষিকা,
পথে আমাকে দেখে সকলে আমা থেকে পালিয়ে যায়।   [ধুয়ো]

মৃতের মত আমাকে ভুলে গেছে সবাই,
আমি হয়েছি ফেলানো একটা পাত্রের মত।
আমি কিন্তু তোমাতে ভরসা রাখি, প্রভু;
আমি বলি, ‘তুমি আমার পরমেশ্বর, তোমার হাতেই আমার আয়ুষ্কাল,’   [ধুয়ো]

আমার শত্রুদের, আমার নিপীড়কদের হাত থেকে আমাকে উদ্ধার কর।
তোমার দাসের উপর শ্রীমুখ উজ্জ্বল করে তোল,
তোমার কৃপায় ত্রাণ কর আমায়।
শক্ত হও, অন্তর দৃঢ় করে তোল তোমরা, তোমরা সকলে, যারা প্রভুর
প্রত্যাশায় আছ।   [ধুয়ো]

৪। দ্বিতীয় পাঠ
হিব্রুদের কাছে পত্র থেকে পাঠ (৪:১৪-১৬; ৫:৭-৯)

প্রিয়জনেরা, যেহেতু আমরা এক পরম মহাযাজককে পেয়েছি যিনি আকাশমণ্ডল অতিক্রম করেছেন—সেই ঈশ্বরপুত্র যিশু—সেজন্য এসো, আমরা আমাদের বিশ্বাস-স্বীকৃতির ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিষ্ঠিত থাকি। কেননা আমরা এমন মহাযাজককে পাইনি, যিনি আমাদের দুর্বলতার সমব্যথী হতে অক্ষম, তিনি বরং পাপ ছাড়া আমাদের মতই সবদিক দিয়ে পরীক্ষিত হয়েছেন।
সুতরাং এসো, সাহসভরে আমরা অনুগ্রহের সিংহাসনের কাছে এগিয়ে যাই, যেন দয়া লাভ করি এবং প্রয়োজনের দিনে সহায়তার সঙ্গে অনুগ্রহ পাই।
সেই খ্রিষ্ট তাঁর পার্থিব জীবনকালে, একটা তীব্র আর্তনাদে ও চোখের জলে তাঁরই কাছে প্রার্থনা ও মিনতি উৎসর্গ ক’রে যিনি তাঁকে মৃত্যু থেকে ত্রাণ করতে সক্ষম, ও তাঁর এই ভক্তি-সম্ভ্রমের জন্য সাড়া পেয়ে, পুত্র হয়েও নিজের দুঃখকষ্ট থেকে বাধ্যতা শিখেছিলেন, এবং নিজ সিদ্ধতায় চালিত হয়ে তিনি, তাঁর প্রতি যারা বাধ্য, তাদের সকলেরই অনন্ত পরিত্রাণের কারণ হয়ে উঠলেন।
ঈশ্বরের বাণী।

৫। সুসমাচার বরণ-গীতি
হে খ্রিষ্ট প্রভু, স্তবস্তুতি ও গৌরবের যোগ্য তুমি।
খ্রিষ্ট আমাদের জন্য মৃত্যু পর্যন্ত,
এমনকি ক্রুশমৃত্যু পর্যন্তই নিজেকে বাধ্য করলেন।
এইজন্য ঈশ্বর তাঁকে উন্নীত করলেন
ও তাঁকে দিলেন সেই নাম, সকল নামের চেয়ে শ্রেষ্ঠ যে নাম।
হে খ্রিষ্ট প্রভু, স্তবস্তুতি ও গৌরবের যোগ্য তুমি।

৬। সুসমাচার
[ ✚ চিহ্নিত অংশগুলি খ্রিষ্টের উক্তি। ★ চিহ্নিত অংশগুলি অন্য লোকের উক্তি। ♦ চিহ্নিত অংশগুলি কোন দলের বা জনতার উক্তি। ➪ চিহ্নিত অংশগুলি কাহিনী-মূলক অংশ, তা পাঠকই পড়বেন।]
যোহন-রচিত আমাদের প্রভু যিশুখ্রিষ্টের যন্ত্রণাভোগ-কাহিনী (১৮:১–১৯:৪২)

 ➪ যিশু নিজের শিষ্যদের সঙ্গে বেরিয়ে গিয়ে কেদ্রোন গিরিখাদের ওপারে গেলেন; সেখানে একটা বাগান ছিল; তিনি ও তাঁর শিষ্যেরা সেই বাগানে প্রবেশ করলেন। জায়গাটা বিশ্বাসঘাতক সেই যুদারও পরিচিত ছিল, কারণ যিশু তাঁর শিষ্যদের সঙ্গে প্রায়ই সেখানে মিলিত হতেন।
যুদা সৈন্যদলকে এবং প্রধান যাজকদের ও ফরিসিদের কাছ থেকে জড় করা অনুচারীদের সঙ্গে ক’রে সেখানে এসে উপস্থিত হলেন; তাদের হাতে ছিল লণ্ঠন, মশাল আর নানা অস্ত্র। নিজের কী কী ঘটবে, সে সমস্তই জেনে যিশু এগিয়ে এলেন ও তাদের বললেন,
‘তোমরা কাকে খুঁজছ?’
 ➪ তারা তাঁকে উত্তর দিল,
‘নাজারেথীয় যিশুকে।’
 ➪ যিশু তাদের বললেন,
‘আমিই সে।’
 ➪ বিশ্বাসঘাতক যুদাও তাদের সঙ্গে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ‘আমিই সে’, তিনি তাদের এই কথা বলামাত্র তারা পিছিয়ে গিয়ে মাটিতে পড়ে গেল। তিনি তাদের আবার জিজ্ঞাসা করলেন,
‘তোমরা কাকে খুঁজছ?’
 ➪ তারা বলল,
‘নাজারেথীয় যিশুকে।’
 ➪ যিশু উত্তর দিলেন,
‘আমি তোমাদের বললাম যে, আমিই সে। তোমরা যদি আমাকেই খুঁজছ, তবে এদের যেতে দাও।’
 ➪ এমনটি ঘটল, যিশু যে কথা বলেছিলেন তা যেন পূর্ণ হয়: ‘যাদের তুমি আমাকে দিয়েছ, তাদের মধ্যে একজনকেও হারাইনি।’ সিমোন পিতরের একটা খড়্গ ছিল, তা বের করে তিনি তখন মহাযাজকের চাকরকে আঘাত করে তার ডান কান কেটে ফেললেন—চাকরের নাম ছিল মাল্কস। যিশু পিতরকে বললেন,
‘তোমার খড়্গ কোষে রেখে দাও; এই যে পাত্র পিতা আমাকে দিয়েছেন, আমি কি তা পান করব না?’
 ➪ তাই সৈন্যদল ও তাদের সহস্রপতি এবং ইহুদীদের অনুচারীরা যিশুকে ধরে তাঁকে বেঁধে ফেলল এবং প্রথমে তাঁকে আন্নার কাছে নিয়ে গেল, কারণ তিনি ছিলেন ওই বছরের মহাযাজক কাইয়াফার শ্বশুর। এই কাইয়াফাই ইহুদীদের পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, জনগণের জন্য মাত্র একটি মানুষের মৃত্যু হওয়াই সুবিধাজনক।
এদিকে সিমোন পিতর আর অন্য এক শিষ্য যিশুর অনুসরণ করেছিলেন; এই শিষ্য মহাযাজকের পরিচিত ছিলেন বলে যিশুর সঙ্গে মহাযাজকের প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলেন। পিতর কিন্তু বাইরে থেকে ফটকের কাছে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাই মহাযাজকের পরিচিত ওই শিষ্য বেরিয়ে এসে দ্বাররক্ষিকাকে বলে পিতরকে ভিতরে নিয়ে গেলেন। দ্বাররক্ষিকা দাসীটি পিতরকে বলল,
‘তুমিও কি ওই লোকটার শিষ্যদের একজন নও?’
 ➪ তিনি বললেন,
‘না, আমি তো নই।’
 ➪ চাকরেরা আর অনুচারীরা শীতের জন্য কাঠকয়লার আগুন জ্বালিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে তাপ পোহাচ্ছিল। পিতরও দাঁড়িয়ে তাদের সঙ্গে আগুন পোহাচ্ছিলেন।
তখন মহাযাজক যিশুকে তাঁর শিষ্যদের বিষয় এবং তাঁর শিক্ষা বিষয় জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। যিশু তাঁকে উত্তর দিলেন,
‘আমি জগতের কাছে প্রকাশ্যেই কথা বলেছি, সবসময়ই সমাজগৃহে ও মন্দিরে শিক্ষা দিয়েছি, যেখানে সকল ইহুদী সম্মিলিত হয়। গোপনে তো আমি কিছুই বলিনি। আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন কেন? যারা আমার কথা শুনেছে, তাদেরই জিজ্ঞাসা করুন; আমি তাদের কী কী বলেছি, তারা তা জানে।’
 ➪ তিনি একথা বললে সেখানে উপস্থিত প্রহরীদের একজন যিশুকে চড় মেরে বলল,
‘মহাযাজককে এইভাবে উত্তর দিচ্ছ?’
 ➪ যিশু তাকে উত্তর দিলেন,
‘অন্যায় যদি বলে থাকি, তবে অন্যায় কোথায়, তার সাক্ষ্য দাও; কিন্তু যদি ন্যায্য কথা বলে থাকি, তবে আমাকে কেন মারছ?’
 ➪ আন্না তখন মহাযাজক কাইয়াফার কাছে তাঁকে বাঁধা অবস্থায় পাঠিয়ে দিলেন।
সেসময়ে সিমোন পিতর এমনি দাঁড়িয়ে আগুন পোহাচ্ছিলেন। লোকে তাঁকে বলল,
‘তুমিও কি ওর শিষ্যদের একজন নও?’
 ➪ তিনি এই বলে তা অস্বীকার করলেন,
‘আমি নই।’
 ➪ মহাযাজকের চাকরদের একজন—পিতর যার কান কেটে ফেলেছিলেন তারই এক আত্মীয়—তখন জিজ্ঞাসা করল,
‘ওই বাগানে আমি কি তোমাকে ওর সঙ্গে দেখিনি?’
 ➪ পিতর আবার তা অস্বীকার করলেন, আর তখনই মোরগ ডেকে উঠল।

[পিলাতের সামনে যিশু]

পরে তাঁরা যিশুকে কাইয়াফার কাছ থেকে শাসক-ভবনে নিয়ে গেলেন। তখন ভোর হয়েছে। তাঁরা নিজেরা শাসক-ভবনে প্রবেশ করলেন না, পাছে অশুচি হন, কিন্তু পাস্কাভোজে যেন বসতে পারেন। তাই পিলাত তাঁদের কাছে বেরিয়ে গিয়ে বললেন,
‘এই লোকের বিরুদ্ধে আপনাদের কী অভিযোগ?’
 ➪ তাঁরা তাঁকে উত্তর দিলেন,
‘অপকর্মা না হলে ওকে আপনার হাতে তুলে দিতাম না।’
 ➪ পিলাত তাঁদের বললেন,
‘আপনারাই ওকে নিয়ে যান ও আপনাদের বিধানমতে ওর বিচার করুন।’
 ➪ ইহুদীরা তাঁকে বললেন,
‘আমাদের পক্ষে কারও প্রাণদণ্ড দেওয়া বিধেয় নয়।’
 ➪ এমনটি ঘটল, নিজের যে কীভাবে মৃত্যু হবে, সেবিষয়ে যিশু যা বলেছিলেন, তাঁর সেই কথা যেন পূর্ণ হতে পারে। তখন পিলাত আবার শাসক-ভবনে প্রবেশ করে যিশুকে কাছে ডেকে বললেন,
‘তুমি কি ইহুদীদের রাজা?’
 ➪ যিশু উত্তর দিলেন,
‘আপনি কি নিজে থেকেই একথা বলছেন, না অন্যেরা আমার বিষয়ে আপনাকে বলেছে?’
 ➪ পিলাত উত্তর দিলেন,
‘আমি কি ইহুদী? তোমার স্বজাতিরা ও প্রধান যাজকেরাই তোমাকে আমার হাতে তুলে দিয়েছেন—তুমি কী করেছ?’
 ➪ যিশু উত্তর দিলেন,
‘আমার রাজ্য ইহলোকের নয়। যদি আমার রাজ্য ইহলোকের হত, তাহলে ইহুদীদের হাতে আমাকে যেন তুলে দেওয়া না হয়, তার জন্য আমার লোকজন লড়াই করত; কিন্তু, না, আমার রাজ্য ইহলোকের নয়।’
 ➪ পিলাত তাঁকে বললেন,
‘তাহলে তুমি কি একজন রাজা?’
 ➪ যিশু উত্তর দিলেন,
‘আপনিই তো বলছেন, আমি রাজা। সত্যের বিষয়ে যেন সাক্ষ্য দিতে পারি, এজন্যই আমি জন্মেছি, এজন্যই জগতে এসেছি। যে কেউ সত্যের মানুষ, সে আমার কথায় কান দেয়।’
 ➪ পিলাত তাঁকে বললেন,
‘সত্য! তা আবার কী?’
 ➪ একথা বলার পর তিনি আবার ইহুদীদের কাছে বেরিয়ে গিয়ে বললেন,
‘ওর মধ্যে কোন অপরাধ আমি খুঁজে পাচ্ছি না। আপনাদের জন্য কিন্তু একটা প্রথা আছে যে, পাস্কা উপলক্ষে আমি আপনাদের জন্য একজনকে মুক্ত করে দিই। তবে আপনারা কি চান যে, আমি ইহুদীদের রাজাকে আপনাদের জন্য মুক্ত করে দিই?’
 ➪ তাঁরা আবার চিৎকার করে বললেন,
‘একে নয়, বারাব্বাসকে।’
 ➪ বারাব্বাস ছিল এক দস্যু!
তখন পিলাত যিশুকে নিয়ে গিয়ে কশাঘাত করালেন। এবং সৈন্যেরা কাঁটা দিয়ে একটা মুকুট গেঁথে তাঁর মাথায় পরিয়ে দিল, ও তাঁর গায়ে বেগুনি রঙের একটা চাদর দিল; তাঁর সামনে এসে তারা বলছিল,
‘মঙ্গল হোক, ইহুদীরাজ!’
 ➪ আর তাঁকে চড় দিতে লাগল।
পিলাত আবার বেরিয়ে গিয়ে তাদের বললেন,
‘দেখ, ওকে তোমাদের কাছে বের করে আনছি, তোমরা যেন জানতে পার যে, আমি ওর মধ্যে কোনও অপরাধ খুঁজে পাচ্ছি না।’
 ➪ তাই যিশু বেরিয়ে এলেন—সেই কাঁটার মুকুট আর বেগুনি রঙের চাদর পরিবৃত হয়ে। পিলাত তাদের বললেন,
‘এই সেই মানুষটি!’
 ➪ প্রধান যাজকেরা ও প্রহরীরা তাঁকে দেখতে পেয়ে চিৎকার করে বলল,
‘ক্রুশে দাও, ক্রুশে দাও!’
 ➪ পিলাত তাদের বললেন,
‘তোমরা নিজেরা ওকে নিয়ে যাও ও ক্রুশে দাও, কেননা আমি ওর মধ্যে কোন অপরাধ খুঁজে পাচ্ছি না।’
 ➪ ইহুদীরা তাঁকে উত্তর দিল,
‘আমাদের এক বিধান আছে, আর সেই বিধান অনুসারে ওর মৃত্যু হওয়া উচিত, কেননা সে নিজেকে ঈশ্বরের পুত্র করে তুলেছে।’
 ➪ একথা শুনে পিলাত আরও ভীত হলেন। শাসক-ভবনে আবার প্রবেশ করে তিনি যিশুকে বললেন,
‘তুমি কোথাকার মানুষ?’
 ➪ কিন্তু যিশু তাঁকে কোনও উত্তর দিলেন না। তাই পিলাত তাঁকে বললেন,
‘আমার সঙ্গে কথা বলছ না? তুমি কি জান না, তোমাকে মুক্তি দেওয়ার অধিকার আমার আছে, আবার তোমাকে ক্রুশে দেওয়ার অধিকারও আমার আছে?’
 ➪ যিশু উত্তর দিলেন,
‘আমার উপর আপনার কোনও অধিকারই থাকত না, ঊর্ধ্বলোক থেকে যদি না আপনাকে দেওয়া হত। তাই আমাকে যে আপনার হাতে তুলে দিয়েছে, তারই পাপ আরও গুরুতর।’
 ➪ ফলত পিলাত তাঁকে মুক্তি দিতে চেষ্টা করতে লাগলেন, কিন্তু ইহুদীরা চিৎকার করে বললেন,
‘ওকে যদি মুক্তি দেন, তাহলে আপনি সীজারের বন্ধু নন। যে কেউ নিজেকে রাজা করে তোলে, সে সীজারের বিরোধিতা করে।’
 ➪ একথা শুনে পিলাত যিশুকে বাইরে নিয়ে এলেন আর শাণের চাতাল—হিব্রু ভাষায় গাব্বাথা—নামে স্থানে এক মঞ্চে আসন নিলেন। সে দিনটি ছিল পাস্কার প্রস্তুতি-দিবস, সময় প্রায় দুপুর বারোটা। তিনি ইহুদীদের বললেন,
‘এই যে তোমাদের রাজা!’
 ➪ তারা চিৎকার করে বলল,
‘দূর কর, দূর কর, ওকে ক্রুশে দাও!’
 ➪ পিলাত তাদের বললেন,
‘আমি কি তোমাদের রাজাকে ক্রুশে দেব?’
 ➪ প্রধান যাজকেরা উত্তর দিলেন,
‘সীজার ছাড়া আমাদের কোনও রাজা নেই।’
 ➪ তিনি তখন ক্রুশে দেওয়ার জন্য তাঁকে তাঁদের হাতে তুলে দিলেন।

[যিশুকে ক্রুশে দেওয়া হয়]

তাই তাঁরা যিশুকে নিলেন, আর তিনি নিজের ক্রুশ নিজে বহন করে বেরিয়ে পড়লেন খুলিতলা নামে স্থানে—হিব্রু ভাষায় যার নাম গলগথা। সেখানে তারা তাঁকে ক্রুশে দিল, আর তাঁর সঙ্গে অন্য দু’জনকে—দু’জনকে দু’পাশে, কিন্তু যিশুকেই মাঝখানে। পিলাত একটা দোষনামাও লিখিয়ে রেখেছিলেন, তারা তা ক্রুশের উপরে লাগিয়ে দিল; তাতে লেখা ছিল, ‘যিশু - নাজারেথীয় - ইহুদীদের রাজা।’ বহু ইহুদী ওই দোষনামাটা পড়ল, যেহেতু যেখানে যিশুকে ক্রুশে দেওয়া হয়েছিল, স্থানটি ছিল শহরের কাছাকাছি, আর কথাগুলো হিব্রু, লাতিন ও গ্রীক ভাষায় লেখা ছিল। তখন ইহুদীদের প্রধান যাজকেরা পিলাতকে বললেন,
‘আপনি ইহুদীদের রাজা লিখবেন না, বরং লিখুন, লোকটা বলেছে, আমি ইহুদীদের রাজা।’
 ➪ পিলাত উত্তর দিলেন,
‘যা লিখেছি, লিখেছি।’
 ➪ যিশুকে ক্রুশে দেবার পর সৈন্যেরা তাঁর জামাকাপড় নিয়ে চার ভাগ করল, প্রত্যেক সৈন্যের জন্য এক একটা ভাগ; ভিতরের জামাটাও তারা নিল, কিন্তু জামায় কোন সেলাই ছিল না, উপর থেকে সমস্তই একটানা বোনা ছিল। তাই তারা একে অপরকে বলল,
‘এটা ছিঁড়ব না; এসো, গুলিবাঁট করে দেখি, কার্‌ ভাগে পড়ে।’
 ➪ এমনটি ঘটল যেন শাস্ত্রের এই বচন পূর্ণ হয়, ওরা নিজেদের মধ্যে আমার জামাকাপড় ভাগ করে নিল, আমার পোশাক নিয়ে গুলিবাঁট করল।
তাই সৈন্যেরা সেইমত করল; কিন্তু ক্রুশের ধারে দাঁড়িয়ে যিশুর মা এবং তাঁর মায়ের বোন, ক্লোপাসের স্ত্রী মারীয়া আর মাগদালার মারীয়া ছিলেন। নিজের মাকে ও তাঁর পাশে যে শিষ্যকে তিনি ভালবাসতেন তাঁকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে যিশু মাকে বললেন,
‘নারী, ওই দেখ, তোমার ছেলে।’
 ➪ তারপর তিনি শিষ্যটিকে বললেন,
‘ওই দেখ, তোমার মা।’
 ➪ আর সেই ক্ষণ থেকে শিষ্যটি তাঁকে নিজের ঘরে গ্রহণ করে নিলেন।
তারপর যিশু, সমস্তই এখন সিদ্ধিলাভ করেছে জেনে, শাস্ত্রবাণী যেন সিদ্ধিলাভ করে এজন্য বললেন,
‘আমার তেষ্টা পেয়েছে।’
 ➪ সেখানে সির্কায় ভরা একটা পাত্র ছিল; তাই তারা সির্কায় ভেজানো একটা স্পঞ্জ একটা হিসোপ-ডাঁটার আগায় লাগিয়ে তাঁর মুখের কাছে ধরল। সির্কা গ্রহণ করে যিশু বললেন,
‘সিদ্ধি হয়েছে’
 ➪ এবং মাথা নত করে আত্মা সঁপে দিলেন।

[এই সময়ে সকলে নতজানু হয়ে কিছুক্ষণ নীরব থাকবে]

সেই দিনটি প্রস্তুতি-দিবস ছিল বিধায়, যেন দেহগুলি সাব্বাৎ দিনে ক্রুশে না থেকে যায়,—সেই সাব্বাৎ তো মহা একটা দিবস ছিল,—ইহুদীরা পিলাতের কাছে আবেদন জানাল, তিনজনের পা ভেঙে দিয়ে তাদের যেন তুলে নেওয়া হয়। তাই সৈন্যেরা এল, এবং যিশুর সঙ্গে যাদের ক্রুশে দেওয়া হয়েছিল, প্রথম আর দ্বিতীয়জনের পা ভেঙে দিল। কিন্তু যিশুর কাছে এসে যখন দেখল, ইতিমধ্যে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, তখন তারা তাঁর পা আর ভাঙল না। কিন্তু সৈন্যদের একজন তাঁর বুকের পাশটিতে বর্শা বিঁধিয়ে দিল আর তখনই নিঃসৃত হল রক্ত আর জল।
এবিষয়ে, স্বচক্ষে যিনি দেখেছেন, তিনিই সাক্ষ্য দিয়েছেন, আর তাঁর সাক্ষ্য যথার্থ, এবং তিনি জানেন, তাঁর কথা সত্য, যেন তোমরাও বিশ্বাস করতে পার। কেননা এ সমস্ত ঘটেছিল যেন শাস্ত্রবাণী পূর্ণতা লাভ করে: তাঁর একটা হাড়ও ভগ্ন হবে না। আর একটি শাস্ত্রবচন আছে, যাঁকে তারা বিঁধিয়ে দিয়েছে, তাঁরই দিকে তারা চেয়ে থাকবে!
এর পরে আরিমাথেয়ার যোসেফ—তিনি যিশুর শিষ্য ছিলেন, কিন্তু ইহুদীদের ভয়ে গোপন শিষ্য—যিশুর দেহটি নিয়ে যাবার জন্য পিলাতের কাছে আবেদন জানালেন। পিলাত অনুমতি দিলেন। তাই তিনি এসে দেহটিকে নিয়ে গেলেন। সেই নিকোদেমও এলেন, যিনি যিশুর কাছে প্রথমে রাতের বেলায় গিয়েছিলেন; তিনি প্রায় তেত্রিশ কিলো গন্ধনির্যাস-মেশানো অগুরু নিয়ে এলেন। তাঁরা যিশুর দেহ নিয়ে ইহুদীদের সমাধি-প্রথা অনুসারে সেই গন্ধদ্রব্য-মেশানো ক্ষোম-কাপড়ের ফালি দিয়ে তা জড়িয়ে নিলেন। যে স্থানে তাঁকে ক্রুশে দেওয়া হয়েছিল, সেখানে ছিল একটা বাগান, আর বাগানের মধ্যে একটা নতুন সমাধিগুহা যেখানে আগে কারও সমাধি দেওয়া হয়নি। সেই দিনটি ইহুদীদের পর্বের প্রস্তুতি-দিবস ছিল বিধায় সমাধিগুহাটা কাছাকাছি হওয়ায় তাঁরা যিশুকে সেইখানে শুইয়ে রাখলেন।

প্রভুর বাণী।

৭। উপদেশ
বিশপ সাধু জন খ্রিসোস্তমের ধর্মশিক্ষা

তুমি কি খ্রিষ্টের রক্তের গুণ জানতে ইচ্ছা কর? এসো, তার উদাহরণে ফিরে যাই, তার পূর্বাভাস স্মরণ করি, ও প্রাক্তন সন্ধির কথা বর্ণনা করি। মোশি বলেন, তোমরা এক বছরের মেষশাবক জবাই কর ও তার রক্ত নিয়ে দরজাগুলো চিহ্নিত কর (যাত্রা ১২:৫)। মোশি, আপনি কী বলছেন? মেষের রক্ত কি কখনও বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে মুক্ত করেছে? মনে হচ্ছে তিনি উত্তরে বলেন, অবশ্যই, কিন্তু তা যে রক্ত এর জন্য নয়, বরং এজন্যই যে, সেই রক্ত প্রভুরই রক্তের দিকে অঙুলি নির্দেশ করে। সেই শত্রু যদি দরজার বাজুতে প্রতীকের রক্ত নয়, বরং খ্রিষ্টমন্দিরের দরজার দুই বাজুতে, সেই ভক্তদেরই ওষ্ঠে বাস্তবতার উজ্জ্বল রক্ত দেখে, তবেই এখন সে আগের চেয়ে কোন ক্ষতি না ক’রে চলে যাবে। তুমি কি এ রক্তের আর একটি গুণ দেখতে ইচ্ছা কর? আমি চাই, তুমি ভেবে দেখবে কোথা থেকে প্রথমে সেই রক্ত ঝরে পড়তে লাগল, ও কোন্‌ উৎস থেকে নিঃসৃত হল। সে রক্ত প্রথম ক্রুশ থেকেই নির্গত হল, প্রভুর বুকের পাশটি হল তার উৎস। সুসমাচার বলে, মৃত্যুর পরে যিশু তখনও ক্রুশে ঝুলানো রয়েছেন, এমন সময় এক সৈন্য কাছে গিয়ে তাঁর বুকের পাশটিতে বর্শা বিঁধিয়ে দিল, ও তা থেকে জল ও রক্ত প্রবাহিত হল। জল হল বাপ্তিস্মের, ও রক্ত খ্রিষ্টের দেহরক্তের প্রতীক। সৈন্য বুকের পাশ খুলে দিল, তাতে সে পবিত্র মন্দিরের দেওয়াল অনাবৃত করল, আর আমি মহাধন খুঁজে পেলাম ও উজ্জ্বল ঐশ্বর্য আবিষ্কারে আমি পরম আনন্দিত। একই প্রকারে মেষশাবকের বেলায় ঘটেছে: ইহুদীরা একটা মেষ বলিদান করল, আর আমি সেই বলির ফল ভোগ করলাম। তাঁর বুকের পাশ থেকে নিঃসৃত হল রক্ত ও জল (যোহন ১৯:৩৪)। হে শ্রোতা, আমি চাই না, তুমি তেমন গুপ্ত রহস্যের কথা অতি সহজে পাশ কাটিয়ে যাবে, কেননা আমার আধ্যাত্মিক ও রহস্যাবৃত ব্যাখ্যার আর একটি বাণী বাকি রয়েছে। আমি বলেছি, সেই জল ও রক্ত বাপ্তিস্মের ও খ্রিষ্টের দেহরক্তের প্রতীকে প্রদর্শিত। কেননা পবিত্র মণ্ডলী এ দু’টো সাক্রামেন্ত থেকে, তথা পবিত্র আত্মায় নবজন্ম ও নবীকরণ দানকারী জলপ্রক্ষালন অর্থাৎ কিনা বাপ্তিস্ম থেকে, ও খ্রিষ্টের দেহরক্ত-সাক্রামেন্ত থেকেই জন্ম নিয়েছে—সেই যে সাক্রামেন্ত দু’টো প্রতীকাকারে খ্রিষ্টের বুকের পাশ থেকে নির্গত হল। সুতরাং খ্রিষ্ট আপন বুকের পাশ থেকেই মণ্ডলীকে গড়লেন, যেইভাবে আদমের বুকের পাশ থেকেও তাঁর বধূ হবা গঠিত হয়েছিলেন। এজন্য মোশি আদিমানুষের কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন: আমার হাড়ের হাড় ও আমার মাংসের মাংস (আদি ২:২৩); এতে তিনি প্রভুর বুকের পাশের দিকেই অঙুলি নির্দেশ করছিলেন। একইপ্রকারে যেমন ঈশ্বর আদমের বুকের পাশ থেকেই নারীকে সৃষ্টি করেছিলেন, তেমনি নিজের বুকের পাশ থেকে খ্রিষ্টও আমাদের জল ও রক্ত দান করলেন, যেন মণ্ডলী গঠিত হয়। আর যেমন আদমের নিদ্রাবস্থায়ই ঈশ্বর তাঁর বুকের পাশ খুলে দিয়েছিলেন, তেমনি মৃত্যুনিদ্রার পরেই খ্রিষ্ট জল ও রক্ত আমাদের দান করলেন। দেখ কেমন করে খ্রিষ্ট আপন কনেকে নিজের সঙ্গে মিলিত করলেন, দেখ কোন্‌ খাদ্যে তিনি আমাদের পরিপুষ্ট করেন! একই খাদ্য দ্বারা আমরা জন্মলাভ করি ও পুষ্টি পাই। জননী যেমন আপন বুকের দুধ দিয়ে শিশুর পুষ্টিসাধন করেন ও প্রয়োজন হলে রক্ত দিতে প্রস্তুত, তেমনি খ্রিষ্ট যাদের নবজন্ম দান করেন তাদের তিনি নিজেই আপন রক্ত দানে তাদের পুষ্টিসাধন করে থাকেন।

৮। সার্বজনীন প্রার্থনা
অনুষ্ঠাতা দাঁড়িয়ে প্রসারিত বাহুতে প্রার্থনাটি গান বা পাঠ করেন। অন্যান্যরা পুরো প্রার্থনা ধরে নতজানু হয়ে, না হয় দাঁড়িয়ে থাকে।
ঐতিহ্য রক্ষা করে, অনুষ্ঠাতার প্রার্থনার আগে ঘরের একজন (নিচে তাকে ‘সহকারী’ বলে চিহ্নিত) ‘এসো, নতজানু হই’ ও ‘এসো, সোজা হয়ে দাঁড়াই’ আমন্ত্রণটি ঘোষণা করেন; নীরব প্রার্থনার সময়ে সকলে নতজানু হয়ে থাকবেন।
এ দুর্যোগকালে বিশেষ একটি প্রার্থনা যোগ করা যেতে পারে।
   ক। খ্রিষ্টমণ্ডলীর জন্য
[সহকারী] আমার প্রিয়জনেরা, এসো, ঈশ্বরের পবিত্র মণ্ডলীর জন্য প্রার্থনা করি, আমাদের প্রভু সেই পরমেশ্বর যেন সমগ্র পৃথিবী জুড়ে শান্তি ও একতা দানে তাকে প্রতিপালন করেন। তাঁর আশীর্বাদে আমরা যেন শান্তশিষ্ট জীবন যাপন ক’রে সর্বশক্তিমান পিতা ঈশ্বরের গৌরবকীর্তন করতে পারি।
নীরব প্রার্থনা। তারপর অনুষ্ঠাতা গান করেন:
হে সর্বশক্তিমান সনাতন ঈশ্বর, তুমি খ্রিষ্টে সকল জাতির কাছে তোমার গৌরব প্রকাশ করেছ।
তোমার দয়ার কাজের প্রতি দৃষ্টিপাত কর,
যেন সমগ্র পৃথিবী জুড়ে বিস্তৃত তোমার মণ্ডলী অবিচল বিশ্বাসে তোমার নাম স্বীকারে নিষ্ঠাবান থাকতে পারে।
আমাদের প্রভু সেই খ্রিষ্টের দ্বারা।
সকলে: আমেন।

   খ। মহামান্য পোপের জন্য
[সহকারী] এসো, আমাদের পরমযোগ্য পোপ …-র জন্যও প্রার্থনা করি: যিনি বিশপ-পদে তাঁকে মনোনীত করেছেন, আমাদের প্রভু সেই পরমেশ্বর যেন ঈশ্বরের পবিত্র জনগণকে চালনা করার জন্য তাঁকে তাঁর পবিত্র মণ্ডলীর কল্যাণার্থে সমস্ত ক্ষতি থেকে রক্ষা করেন।
নীরব প্রার্থনা। তারপর অনুষ্ঠাতা গান করেন:
হে সর্বশক্তিমান সনাতন ঈশ্বর, তোমার বিধান ক্রমেই সমস্ত কিছু প্রতিষ্ঠিত!
আমাদের প্রার্থনার প্রতি সদয় দৃষ্টিপাত করে আমাদের জন্য বেছে নেওয়া পোপকে তোমার কৃপায় রক্ষা কর,
যে খ্রিষ্টীয় জনগণ তাদের সৃষ্টিকর্তা সেই তোমারই দ্বারা শাসিত, তারা যেন তাঁর পরিচালনায় বিশ্বাসের পথে উত্তরোত্তর এগিয়ে যেতে পারে।
আমাদের প্রভু সেই খ্রিষ্টের দ্বারা।
সকলে: আমেন।

   গ। সকল শ্রেণির খ্রিষ্টভক্তদের জন্য
[সহকারী] এসো, আমাদের বিশপ …, খ্রিষ্টমণ্ডলীর সকল বিশপ, পুরোহিত ও পরিসেবক, এবং গোটা ভক্তসমাজের জন্যও প্রার্থনা করি।
নীরব প্রার্থনা। তারপর অনুষ্ঠাতা গান করেন:
হে সর্বশক্তিমান সনাতন ঈশ্বর, তোমার পবিত্র আত্মা দ্বারাই সমগ্র মণ্ডলী-দেহ পবিত্রীকৃত ও চালিত।
তোমার সেবকদের জন্য আমাদের এ মিনতি কান পেতে শোন,
যেন তোমার অনুগ্রহ গুণে সকলে বিশ্বস্ততার সঙ্গে তোমার সেবা করে যেতে পারে।
আমাদের প্রভু সেই খ্রিষ্টের দ্বারা।
সকলে: আমেন।

   ঘ। দীক্ষাপ্রার্থীদের জন্য
[সহকারী] এসো, (আমাদের) দীক্ষাপ্রার্থীদের জন্যও প্রার্থনা করি, আমাদের প্রভু সেই পরমেশ্বর যেন তাঁদের অন্তরের শ্রবণদ্বার ও নিজেরও করুণার তোরণদ্বার উন্মুক্ত করেন, যাতে করে নবজন্মদানকারী জলপ্রক্ষালনের মধ্য দিয়ে পাপমোচন লাভ ক’রে তাঁরাও আমাদের প্রভু যিশুখ্রিষ্টে আশ্রয় পেতে পারেন।
নীরব প্রার্থনা। তারপর অনুষ্ঠাতা গান করেন:
হে সর্বশক্তিমান সনাতন ঈশ্বর, তুমি সদা নতুন নতুন সন্তান দানে তোমার মণ্ডলীকে উর্বর করে থাক।
(আমাদের) দীক্ষাপ্রার্থীদের বিশ্বাস ও বোধশক্তি বৃদ্ধি কর,
যেন বাপ্তিস্মের জলকুণ্ডে নবজীবন লাভ ক’রে তাঁরা তোমার আশ্রিত সন্তানদের সংখ্যায় যুক্ত হতে পারেন।
আমাদের প্রভু সেই খ্রিষ্টের দ্বারা।
সকলে: আমেন।

   ঙ। খ্রিষ্টবিশ্বাসীদের ঐক্যের জন্য
[সহকারী] এসো, নিখিল খ্রিষ্টবিশ্বাসী ভাইবোনদের জন্যও প্রার্থনা করি, যেন আমাদের প্রভু ঈশ্বর প্রসন্নতা দেখিয়ে সত্যের সাধক বলে তাদের সকলকে তাঁর অভিন্ন মণ্ডলীতে সম্মিলিত ও সুরক্ষিত করেন।
নীরব প্রার্থনা। তারপর অনুষ্ঠাতা গান করেন:
হে সর্বশক্তিমান সনাতন ঈশ্বর, যা কিছু বিক্ষিপ্ত তা তুমি সম্মিলিত করে থাক, আর যা সম্মিলিত করেছ তা প্রতিপালন করে থাক।
তোমার পুত্রের মেষপালের প্রতি সদয় দৃষ্টিপাত কর:
একই বাপ্তিস্ম যাঁদের পবিত্র করে তুলেছে, তাঁরা যেন নির্ভুল বিশ্বাস দ্বারা একত্রে গৃহীত হয়ে ভালবাসার বন্ধনে একত্রিত হতে পারেন।
আমাদের প্রভু সেই খ্রিষ্টের দ্বারা।
সকলে: আমেন।

   চ। ইহুদীদের জন্য
[সহকারী] এসো, ইহুদী জাতির জন্যও প্রার্থনা করি: আমাদের ঈশ্বর প্রভু প্রথম কালে যাঁদের কাছে কথা বলেছিলেন, তাঁর আশীর্বাদে তাঁরা যেন তাঁর নামের প্রতি ভক্তিতে ও তাঁর সন্ধির প্রতি বিশ্বস্ততায় উত্তরোত্তর এগিয়ে চলতে পারেন।
নীরব প্রার্থনা। তারপর অনুষ্ঠাতা গান করেন:
হে সর্বশক্তিমান সনাতন ঈশ্বর, তুমি আব্রাহাম ও তাঁর বংশের কাছেই তোমার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে।
প্রসন্ন হয়ে তোমার মণ্ডলীর মিনতি কান পেতে শোন:
তোমার সন্ধির প্রথমজাত যাঁরা, তোমার আশীর্বাদে তাঁরা যেন মুক্তির পূর্ণতায় উপনীত হতে পারেন।
আমাদের প্রভু সেই খ্রিষ্টের দ্বারা।
সকলে: আমেন।

   ছ। খ্রিষ্টে বিশ্বাস করে না যারা, তাদের জন্য
[সহকারী] যারা খ্রিষ্টে বিশ্বাস করে না, এসো, তাদের জন্যও প্রার্থনা করি: পবিত্র আত্মার আলোতে বিভাসিত হয়ে তারাও যেন পরিত্রাণের পথে প্রবেশ করতে পারে।
নীরব প্রার্থনা। তারপর অনুষ্ঠাতা গান করেন:
হে সর্বশক্তিমান সনাতন ঈশ্বর, বর প্রদান কর: যারা খ্রিষ্টকে স্বীকার করে না, তারা যেন তোমার সাক্ষাতে সরল অন্তরে চলে সত্যকে খুঁজে পেতে পারে।
আমাদেরও আশীর্বাদ কর, পারস্পরিক বৃদ্ধিশীল ভালবাসায় এগিয়ে চলতে চলতে
ও তোমার জীবন-রহস্য পূর্ণতর ভাবে উপলব্ধি করার জন্য তৎপর হয়ে যেন জগতে তোমার ভালবাসার বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষী হতে পারি।
আমাদের প্রভু সেই খ্রিষ্টের দ্বারা।
সকলে: আমেন।

   জ। ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না যারা, তাদের জন্য
[সহকারী] যারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না, এসো, তাদের জন্যও প্রার্থনা করি, যা ন্যায় সরল অন্তরে তা অনুধাবন ক’রে তারা যেন স্বয়ং ঈশ্বরের কাছেই গিয়ে পৌঁছতে পারে।
নীরব প্রার্থনা। তারপর অনুষ্ঠাতা গান করেন:
হে সর্বশক্তিমান সনাতন ঈশ্বর, তুমি সকল মানুষকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছ যাতে তারা নিয়তই বাসনা করেই তোমাকে সন্ধান করে, ও তোমার সন্ধান পেয়ে শান্তি ভোগ করে।
আশীর্বাদ কর: সমস্ত বাধাবিপত্তির মধ্যেও সকলে যেন তোমার ভালবাসার চিহ্ন ও তোমার বিশ্বাসীদের শুভকর্মের সাক্ষ্য উপলব্ধি ক’রে
তোমাকে অনন্য প্রকৃত ঈশ্বর ও সকলের পিতা বলে স্বীকার ক’রে সুখ-শান্তি লাভ করে।
আমাদের প্রভু সেই খ্রিষ্টের দ্বারা।
সকলে: আমেন।

   ঝ। রাষ্ট্রের পরিচালকদের জন্য
[সহকারী] এসো, রাষ্ট্রের পরিচালকদের জন্যও প্রার্থনা করি, আমাদের প্রভু সেই পরমেশ্বর যেন সকলের প্রকৃত শান্তি ও স্বাধীনতার লক্ষ্যে তাঁদের মন ও হৃদয় তাঁর ইচ্ছা অনুসারে চালনা করেন।
নীরব প্রার্থনা। তারপর অনুষ্ঠাতা গান করেন:
হে সর্বশক্তিমান সনাতন ঈশ্বর, তোমারই হাতে মানুষের আশা ও সকল জাতির মানব-অধিকার!
আমাদের শাসন-পরিচালনার ভার যাঁদের হাতে রয়েছে, প্রসন্ন হয়ে তাঁদের দিকে মুখ তুলে চাও,
যেন তোমার সহায়তায় সমগ্র পৃথিবীতে সকল জাতির সমৃদ্ধি, শান্তিজনিত নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা স্থিতমূল থাকে।
আমাদের প্রভু সেই খ্রিষ্টের দ্বারা।
সকলে: আমেন।

   ঞ। দুঃখক্লিষ্টদের জন্য
[সহকারী] প্রিয়জনেরা, এসো, সর্বশক্তিমান পিতা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, যেন জগৎকে ভুলভ্রান্তি থেকে মুক্ত করেন, রোগ-ব্যাধি মুছে দেন, দুর্ভিক্ষ দূর করে দেন, অন্যায্য কারাগার খুলে দেন, অত্যাচারিতের বন্ধন ছিন্ন করেন, যাত্রী সকলকে নিরাপত্তা দান করেন, উদ্বাস্তুদের স্বদেশে ফিরিয়ে আনেন, রোগপীড়িতদের সুস্থতা, ও মরণাপন্নদের অনন্ত বিশ্রাম দান করেন।
নীরব প্রার্থনা। তারপর অনুষ্ঠাতা গান করেন:
হে সর্বশক্তিমান সনাতন ঈশ্বর, তুমিই দুঃখার্তের সান্ত্বনা, শ্রান্তের শক্তি।
যেকোন ক্লেশ থেকে যারা তোমাকে ডাকে, তাদের মিনতি তোমার কর্ণগোচর হোক,
সকলে যেন নিজ নিজ প্রয়োজনে তোমার করুণার স্পর্শ পেয়ে ধন্য হয়।
আমাদের প্রভু সেই খ্রিষ্টের দ্বারা।
সকলে: আমেন।

দ্বিতীয় ভাগ
পবিত্র ক্রুশ আরাধনা
৯। পবিত্র ক্রুশ প্রদর্শন
ক্রুশটি যেখানে রাখা হয়েছিল, সেখান থেকে জ্বলন্ত বাতি হাতে দু’জনকে সঙ্গে নিয়ে সহকর্মী শোভাযাত্রা করে বেগুনি রঙের একটি আবরণে ঢাকা ক্রুশটি ঘরের ভিতর দিয়ে বেদি বা আসনের সামনে বহন করেন।
বেদি বা আসনের সামনে দাঁড়িয়ে ও জনগণমুখী হয়ে অনুষ্ঠাতা ক্রুশটি গ্রহণ করে নিয়ে সেটির উপরীভাগ কিছুটা অনাবৃত করে ‘এই দেখ সেই ক্রুশ-বৃক্ষ’ উক্তিটি গান করতে করতে ক্রুশটি উচ্চ করে তোলেন। সকলে উত্তরে গান ধরেন, ‘এসো, প্রণিপাত করি’। গান শেষে সকলে প্রণিপাত করে কিছুক্ষণ নীরবে আরাধনা করেন; অনুষ্ঠাতা কিন্তু দাঁড়িয়ে ক্রুশটিকে উচ্চ করে রাখেন।
দেখ সেই ক্রুশ-বৃক্ষ,
যাতে ঝুলেছে জগতের পরিত্রাণ।
সকলে: এসো, প্রণিপাত করি।
তারপর অনুষ্ঠাতা ক্রুশের ডান বাহু অনাবৃত করেন, ও পুনরায় ক্রুশটি উচ্চ করতে করতে ‘এই দেখ সেই ক্রুশ-বৃক্ষ’ উক্তিটি গান করেন; ইত্যাদি উপরে দেওয়া বর্ণনা অনুসারে।
অবশেষে তিনি ক্রুশটিকে সম্পূর্ণ রূপে অনাবৃত করে তা উচ্চ করতে করতে তৃতীয় বারের মত ‘এই দেখ সেই ক্রুশ-বৃক্ষ’ আহ্বান-উক্তিটি গান করেন; ইত্যাদি প্রথম বারের মত।

১০। পবিত্র ক্রুশ আরাধনা
এসময় জ্বলন্ত বাতি হাতে ঘরের দু’জনকে সঙ্গে নিয়ে অনুষ্ঠাতা বেদি বা আসনের সামনে ক্রুশ বহন করে তা নিচে রাখেন। ক্রুশের ডান ও বাঁ পাশে বাতি রাখা হয়।
ক্রুশ আরাধনার জন্য, সবার আগে অনুষ্ঠাতা একা এগিয়ে আসেন। তারপর কেমন যেন শোভাযাত্রা করেই অন্যান্য সকলে এগিয়ে এসে ক্রুশ-চুম্বনের মধ্য দিয়ে ক্রুশের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
ক্রুশ আরাধনা অনুষ্ঠান চলাকালে, প্রভুর অভিযোগ-মালা গাওয়া হয়; এসময় যাঁরা ইতিমধ্যে ক্রুশ আরাধনা করে গেছেন তাঁরা বসে থাকেন।

১১। প্রভুর অভিযোগমালা
ধুয়ো: হে আমার আপন জাতি, কি করেছি তোমায়?
কিসেতেই বা তোমাকে দুঃখ দিয়েছি? আমাকে উত্তর দাও!

মিশর দেশ থেকে আমি
বের করে এনেছি তোমায়:
এজন্যই বুঝি তোমার ত্রাতার জন্য তুমি
ব্যবস্থা করেছ ক্রুশ।   [ধুয়ো]

চল্লিশ বছর ধরে আমি তোমাকে প্রান্তরে চালনা করেছিলাম,
তোমাকে দিয়েছিলাম সেই মান্না খাদ্য,
তোমাকে প্রবেশ করিয়েছিলাম মঙ্গলদানে পূর্ণ এক দেশে:
এজন্যই বুঝি তোমার ত্রাতার জন্য তুমি ব্যবস্থা করেছ ক্রুশ।   [ধুয়ো]

তোমার জন্য আমি আর কী করতে পারতাম যা করিনি?
আমারই নিজস্ব সুন্দরতম সেরা আঙুরলতা বলে পুঁতেছিলাম তোমায়,
কিন্তু তুমি আমার কাছে হয়ে গেছ তিক্ত:
এজন্যই বুঝি আমার তৃষ্ণায় তুমি আমায় পান করিয়েছ সির্কা, বর্শা দিয়ে বিঁধিয়ে দিয়েছ তোমার ত্রাতার বুক।   [ধুয়ো]

তোমার খাতিরেই আমি মিশর ও তার সকল প্রথমজাতকে
আঘাত করেছিলাম কশা দিয়ে,
আর তুমি ধরিয়ে দিয়েছ আমায়
আমাকে যেন কশাঘাত করা হয়।   [ধুয়ো]

লোহিত সাগরে ফারাওকে ডুবিয়ে দিয়ে
আমি মিশর থেকে বের করে এনেছি তোমায়,
আর তুমি ধরিয়ে দিয়েছ আমায়
মহাযাজকদের হাতে।   [ধুয়ো]

তোমার সামনে আমি সাগরকে দু’ ভাগ ক’রে
তোমার জন্য খুলে দিয়েছিলাম গমনপথ,
আর তুমি বর্শার আঘাতে
খুলে দিয়েছ আমার বুক।   [ধুয়ো]

আমি তোমার সামনে মেঘস্তম্ভে চলে
তোমাকে চালনা করতাম,
আর তুমি পিলাতের প্রাসাদে
চালনা করেছ আমায়।   [ধুয়ো]

প্রান্তরে আমি তোমার উপর
বর্ষণ করেছিলাম মান্না,
আর তুমি আমার উপর
চপেটাঘাত ও কশা করেছ বর্ষণ।   [ধুয়ো]

তোমার তৃষ্ণায় আমি
পান করিয়েছিলাম শৈল থেকে নিঃসৃত পরিত্রাণের জল,
আর তুমি আমার তৃষ্ণায়
পান করিয়েছ পিত্তি-মেশানো সির্কা।   [ধুয়ো]

তোমার খাতিরে আমি
কানানের রাজাদের করেছিলাম আঘাত,
আর তুমি একটা ডাঁটা দিয়ে
আঘাত হেনেছ আমার মাথায়।   [ধুয়ো]

আমি রাজ-দণ্ড দানে
ভূষিত করেছিলাম তোমায়,
আর তুমি কাঁটার মুকুটে
ভূষিত করেছ আমায়।   [ধুয়ো]

আমি মহা প্রতাপে
উত্তোলন করেছিলাম তোমায়,
আর তুমি ক্রুশের যূপকাষ্ঠে
ঝুলিয়েছ আমায়।   [ধুয়ো]

আরাধনা অনুষ্ঠান শেষ হলে সহকর্মী ক্রুশটিকে বেদিতে বা আসনে রাখেন। বেদি বা আসনের চারপাশে নানা জ্বলন্ত বাতি রাখা হবে।

১২। শেষ প্রার্থনা: এসো, প্রার্থনা করি।
হে সর্বশক্তিমান সনাতন ঈশ্বর, তোমার খ্রিষ্টের ধন্য মৃত্যু ও পুনরুত্থান দ্বারা তুমি আমাদের নবায়িত করেছ। আমাদের অন্তরে তোমার করুণার কর্মফল রক্ষা কর, যেন এ মহারহস্যে যোগদানের ফলে অবিরতই ভক্তিময় জীবন যাপন করি।
আমাদের প্রভু সেই খ্রিষ্টের দ্বারা।
সকলে: আমেন।

অনুষ্ঠাতা হাত প্রসারিত করে সকলের উপর এ প্রার্থনা উচ্চারণ করেন:
হে প্রভু, যারা তোমার পুত্রের পুনরুত্থানের আশায় তাঁর মৃত্যুর স্মৃতি পালন করে এসেছেন, তাদের উপর তোমার আশীর্বাদ অপর্যাপ্ত মাত্রায় নেমে আসুক, আসুক পাপের ক্ষমা ও সান্ত্বনা, বিশ্বাস বৃদ্ধিলাভ করুক, সুনিশ্চিত হোক চিরন্তন মুক্তির প্রত্যাশা।
সকলে: আমেন।

এভাবেই অনুষ্ঠান সমাপ্ত।
অনুষ্ঠানের পরে বেদি বা আসন সম্পূর্ণরূপে সাজ-সজ্জাহীন করা হবে, কিন্তু দু’টো বা চারটে দীপাধার-সহ ক্রুশটি বেদিতে থাকবে।

[সূচী]    


পুণ্য সপ্তাহ - শনিবার
পাতালে অবরোহণ করে
প্রভু যিশু বন্দিদের উদ্ধার করেন।
ছবিতে,
আদম হবা ও দাউদ রাজার সঙ্গে
অন্য ব্যক্তিত্বও প্রদর্শিত।
পুণ্য শনিবারে মণ্ডলী প্রার্থনায় ও উপবাসে প্রভুর যন্ত্রণাভোগ, মৃত্যু ও পাতালে তাঁর অবরোহণের কথা অনুধ্যান ক’রে তাঁর সমাধিগুহার ধারে তাঁর পুনরুত্থানের অপেক্ষায় থাকে।
পবিত্র বেদি সাজ-সজ্জাহীন রেখে মণ্ডলী খ্রিষ্টযাগ উৎসর্গ থেকে বিরত থাকে জাগরণী মহতী অনুষ্ঠান অর্থাৎ পুনরুত্থানের রাত্রিকালীন প্রতীক্ষা কাল পর্যন্ত। তখনই প্রতীক্ষার স্থানে আসবে সেই পাস্কার আনন্দ যা পঞ্চাশ দিন ধরে মণ্ডলীর জীবন পূর্ণ করবে।

প্রাতঃকালীন ঐচ্ছিক অনুষ্ঠান
১। সূচনা

সকলে ক্রুশ চিহ্ন করতে করতে অনুষ্ঠাতা বলেন,
- দোহাই পরমেশ্বর, আমাকে কর উদ্ধার;
    -আমার সহায়তায় শীঘ্রই এসো, প্রভু।
- পিতা ও পুত্র ও পবিত্র আত্মার গৌরব হোক।
    - আদিতে যেমন হইত, এখন যেমন হইতেছে, এবং যুগে যুগে সতত হইবে। আমেন।

২। সামসঙ্গীত ৬৪
ধুয়ো: শোন, সর্বজাতি,
আমার দুঃখ চেয়ে দেখ।

শোন, পরমেশ্বর, আমার বিলাপের কণ্ঠ,
শত্রুর ভয়ভীতি থেকে আমার জীবন রক্ষা কর।
দুষ্কর্মাদের চক্রান্ত থেকে, অপকর্মাদের কোলাহল থেকে
আমাকে লুকিয়ে রাখ।   [ধুয়ো]

ওরা জিহ্বা তীক্ষ্ণ করে খড়্গের মত,
তীরের মতই ছোড়ে তিক্ত কথা।
নিভৃতস্থান থেকে ওরা নির্দোষকে লক্ষ করে,
হঠাৎ তীর ছোড়ে, আর কিছুই করে না ভয়।   [ধুয়ো]

কুকর্মের জন্য ওরা মন স্থির করে, গোপনে ফাঁদ পাতার ষড়যন্ত্র করে,
ওরা বলে, ‘কে তা দেখতে পাবে?’
অন্যায়ের কথা ভেবে ওরা সুচিন্তিত ফন্দি খাটায়।
মানুষ তো একটা সমাধিস্থল, তার অন্তর অতল।   [ধুয়ো]

পরমেশ্বর কিন্তু ওদের উপর তীর ছুড়বেন,
হঠাৎ আহত হবে ওরা;
ওদের নিজেদের জিহ্বাই ঘটাবে ওদের পতন,
ওদের দেখে সবাই মাথা নেড়ে উপহাস করবে।   [ধুয়ো]

তখন ভয় পেয়ে সকলে পরমেশ্বরের কীর্তিকথা প্রচার করবে,
তিনি যা সাধন করেছেন, তা বুঝতে পারবে।
ধার্মিকজন প্রভুতে আনন্দ করবে, প্রভুতে আশ্রয় নেবে;
সরলহৃদয় সকল মানুষ উৎফুল্ল হবে।   [ধুয়ো]

সর্বস্রষ্টা পিতা,
বিশ্বত্রাতা পুত্র,
সান্ত্বনাদানকারী পবিত্র আত্মা,
ত্রিত্বের গৌরব হোক চিরকালের মত। আমেন।   [ধুয়ো]

৩। বাণী পাঠ (হো ৫:১৫-৬:১-৩ক)
প্রভুর উক্তি: সঙ্কটে তারা সযত্নেই আমার অনুসন্ধান করবে। এসো, প্রভুর কাছে ফিরে যাই, তিনি আমাদের ছিঁড়ে ফেললেন, কিন্তু আমাদের নিরাময় করবেন; আমাদের আঘাত করলেন, কিন্তু বেঁধে দেবেন আমাদের ক্ষতস্থান। দু’ দিন পরে তিনি আমাদের পুনরুজ্জীবিত করবেন, আর তৃতীয় দিনে আমাদের পুনরুত্থিত করবেন; তখন তাঁরই সাক্ষাতে আমরা জীবনযাপন করব।

৪। উপদেশ
সাধু জন খ্রিসোস্তমের ধর্মশিক্ষা

তুমি কি খ্রিষ্টের রক্তের গুণ জানতে ইচ্ছা কর? এসো, তার উদাহরণে ফিরে যাই, তার পূর্বাভাস স্মরণ করি, ও প্রাক্তন সন্ধির কথা বর্ণনা করি। মোশি বলেন, তোমরা এক বছরের মেষশাবক জবাই কর ও তার রক্ত নিয়ে দরজাগুলো চিহ্নিত কর (যাত্রা ১২:৫)। মোশি, আপনি কী বলছেন? মেষের রক্ত কি কখনও বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে মুক্ত করেছে? মনে হচ্ছে তিনি উত্তরে বলেন, অবশ্যই, কিন্তু তা যে রক্ত এর জন্য নয়, বরং এজন্যই যে, সেই রক্ত প্রভুরই রক্তের দিকে অঙুলি নির্দেশ করে। সেই শত্রু যদি দরজার বাজুতে প্রতীকের রক্ত নয়, বরং খ্রিষ্টমন্দিরের দরজার দুই বাজুতে, সেই ভক্তদেরই ওষ্ঠে বাস্তবতার উজ্জ্বল রক্ত দেখে, তবেই এখন সে আগের চেয়ে কোন ক্ষতি না ক’রে চলে যাবে।
তুমি কি এ রক্তের আর একটি গুণ দেখতে ইচ্ছা কর? আমি চাই, তুমি ভেবে দেখবে কোথা থেকে প্রথমে সেই রক্ত ঝরে পড়তে লাগল, ও কোন্‌ উৎস থেকে নিঃসৃত হল। সে রক্ত প্রথম ক্রুশ থেকেই নির্গত হল, প্রভুর বুকের পাশটি হল তার উৎস। সুসমাচার বলে, মৃত্যুর পরে যিশু তখনও ক্রুশে ঝুলানো রয়েছেন, এমন সময় এক সৈন্য কাছে গিয়ে তাঁর বুকের পাশটিতে বর্শা বিঁধিয়ে দিল, ও তা থেকে জল ও রক্ত প্রবাহিত হল। জল হল বাপ্তিস্মের, ও রক্ত খ্রিষ্টের দেহরক্তের প্রতীক। সৈন্য বুকের পাশ খুলে দিল, তাতে সে পবিত্র মন্দিরের দেওয়াল অনাবৃত করল, আর আমি মহাধন খুঁজে পেলাম ও উজ্জ্বল ঐশ্বর্য আবিষ্কারে আমি পরম আনন্দিত। একই প্রকারে মেষশাবকের বেলায় ঘটেছে: ইহুদীরা একটা মেষ বলিদান করল, আর আমি সেই বলির ফল ভোগ করলাম।
তাঁর বুকের পাশ থেকে নিঃসৃত হল রক্ত ও জল (যোহন ১৯:৩৪)। হে শ্রোতা, আমি চাই না, তুমি তেমন গুপ্ত রহস্যের কথা অতি সহজে পাশ কাটিয়ে যাবে, কেননা আমার আধ্যাত্মিক ও রহস্যাবৃত ব্যাখ্যার আর একটি বাণী বাকি রয়েছে। আমি বলেছি, সেই জল ও রক্ত বাপ্তিস্মের ও খ্রিষ্টের দেহরক্তের প্রতীকে প্রদর্শিত। কেননা পবিত্র মণ্ডলী এ দু’টো সাক্রামেন্ত থেকে, তথা পবিত্র আত্মায় নবজন্ম ও নবীকরণ দানকারী জলপ্রক্ষালন অর্থাৎ কিনা বাপ্তিস্ম থেকে, ও খ্রিষ্টের দেহরক্ত-সাক্রামেন্ত থেকেই জন্ম নিয়েছে—সেই যে সাক্রামেন্ত দু’টো প্রতীকাকারে খ্রিষ্টের বুকের পাশ থেকে নির্গত হল। সুতরাং খ্রিষ্ট আপন বুকের পাশ থেকেই মণ্ডলীকে গড়লেন, যেইভাবে আদমের বুকের পাশ থেকেও তাঁর বধূ হবা গঠিত হয়েছিলেন।
এজন্য মোশি আদিমানুষের কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন: আমার হাড়ের হাড় ও আমার মাংসের মাংস (আদি ২:২৩); এতে তিনি প্রভুর বুকের পাশের দিকেই অঙুলি নির্দেশ করছিলেন। একইপ্রকারে যেমন ঈশ্বর আদমের বুকের পাশ থেকেই নারীকে সৃষ্টি করেছিলেন, তেমনি নিজের বুকের পাশ থেকে খ্রিষ্টও আমাদের জল ও রক্ত দান করলেন, যেন মণ্ডলী গঠিত হয়। আর যেমন আদমের নিদ্রাবস্থায়ই ঈশ্বর তাঁর বুকের পাশ খুলে দিয়েছিলেন, তেমনি মৃত্যুনিদ্রার পরেই খ্রিষ্ট জল ও রক্ত আমাদের দান করলেন।
দেখ কেমন করে খ্রিষ্ট আপন কনেকে নিজের সঙ্গে মিলিত করলেন, দেখ কোন্‌ খাদ্যে তিনি আমাদের পরিপুষ্ট করেন! একই খাদ্য দ্বারা আমরা জন্মলাভ করি ও পুষ্টি পাই। জননী যেমন আপন বুকের দুধ দিয়ে শিশুর পুষ্টিসাধন করেন ও প্রয়োজন হলে রক্ত দিতে প্রস্তুত, তেমনি খ্রিষ্ট যাদের নবজন্ম দান করেন তাদের তিনি নিজেই আপন রক্ত দানে তাদের পুষ্টিসাধন করে থাকেন।

৫। বিকল্প উপদেশ
পুণ্য শনিবার উপলক্ষে প্রাচীন উপদেশ

কী ঘটেছে? আজ পৃথিবী জুড়ে মহা নিস্তব্ধতা: মহা নিস্তব্ধতা ও নির্জনতা বিরাজ করছে। মহা নিস্তব্ধতা, কেননা রাজা নিদ্রা যাচ্ছেন; পৃথিবী ভয়ে অভিভূত হয়ে নীরব থাকল, কেননা মাংসধারী ঈশ্বর ঘুমিয়ে পড়লেন ও যারা বহুদিন থেকে নিদ্রা গিয়েছিল তিনি তাদের জাগিয়ে তুললেন। ঈশ্বর মাংস অনুসারে মরলেন ও পাতাল আলোড়িত করতে অবরোহণ করলেন।
অবশ্যই, তিনি আদিপিতাকে হারানো মেষেরই মত যেন খোঁজ করতে যাচ্ছেন। যারা অন্ধকারে ও মৃত্যু-ছায়ায় বসে আছে, তিনি নিজে গিয়ে তাদের অবস্থা দেখতে চাচ্ছেন; ঈশ্বর ও তাঁর পুত্র কারারুদ্ধ আদমকে ও সেইসঙ্গে বন্দি হবাকে দুঃখযন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে যাচ্ছেন।
বিজয়ী অস্ত্র-ক্রুশ হাতে করে প্রভু তাদের সেইখানে প্রবেশ করছেন। তাঁকে দেখেই আদিপিতা আদম বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে চিৎকার করে সকলকে বললেন, আমার প্রভু সকলের সঙ্গে সঙ্গে থাকুন! উত্তরে খ্রিষ্ট আদমকে বললেন, তোমারও সঙ্গে সঙ্গে থাকুন। এবং তাঁর হাত ধরে তিনি তাঁকে নাড়া দিয়ে বললেন, ঘুমিয়ে রয়েছ যে তুমি, জেগে ওঠ, মৃতদের মধ্য থেকে নিদ্রাভঙ্গ হও, আর খ্রিষ্ট তোমাকে উদ্ভাসিত করবেন (এফে ৫:১৪)।
আমি তোমার ঈশ্বর, যিনি তোমার জন্য তোমার সন্তান হলাম; যিনি তোমার জন্য ও এদের জন্য ও তোমার উত্তরপুরুষদের জন্য এখন বলছি, ও যারা শেকলাবদ্ধ ছিল, পূর্ণ অধিকারে তাদের আদেশ করছি, বেরিয়ে যাও; আর যারা অন্ধকারে ছিল, তাদের বলছি: উদ্ভাসিত হও; আর নিদ্রাগতদের বলছি: পুনরুত্থিত হও!
তোমাকে নির্দেশ করছি, জেগে ওঠ, হে নিদ্রাগত: কেননা তুমি যেন পাতালে বন্দি হয়ে থাক সেজন্য তো আমি তোমাকে গড়িনি। মৃতদের মধ্য থেকে নিদ্রাভঙ্গ হও; আমি যে মৃতদের জীবন। ওঠ, আমার হাতের কাজ; ওঠ, আমার প্রতিমূর্তি, যা আমার সাদৃশ্যে গড়া হয়েছিলে। ওঠ, এখান থেকে বেরিয়ে যাই; কেননা তুমি আমার মধ্যে আর আমি তোমার মধ্যে একমাত্র ব্যক্তিত্ব।
তোমার জন্য, তোমার ঈশ্বর যে আমি, তোমার সন্তান হলাম; তোমার জন্য, প্রভু যে আমি, তোমার দাসস্বরূপ ধারণ করলাম; তোমার জন্য, আমি ঊর্ধ্বলোকেই যাঁর আবাস, পৃথিবীতে ও পৃথিবীর নিচে এলাম; মানুষ-তোমারই জন্য আমি অসহায় মানুষ হলাম, কিন্তু আজ মুক্ত হয়ে মৃতদের মধ্যে উপস্থিত; সেই তোমারই জন্য, যে বাগান থেকে বেরিয়ে গেছিলে, আমাকে এক বাগানে ইহুদীদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে ও এক বাগানে ক্রুশে দেওয়া হয়েছে।
চেয়ে দেখ আমার মুখে সেই থুথু, যা আমি তোমার জন্য গ্রহণ করে নিয়েছি যেন তোমাকে তোমার আদি প্রাণবায়ুর হাতে ফিরিয়ে দিতে পারি; দেখ আমার গালে চপেটাঘাতের চিহ্ন, যা আমি সহ্য করেছি যেন তোমার বিকৃত স্বরূপকে আমার সাদৃশ্যে নবায়ন করতে পারি। দেখ আমার পিঠে কশাঘাতের চিহ্ন, যা সহ্য করেছি যেন সেই পাপের বোঝা যা তোমার পিঠে চাপা ছিল তা ফেলে দিতে পারি। দেখ আমার হাত দু’টো, যা সেই তোমারই মঙ্গলের জন্য ক্রুশে বিদ্ধ হল—তুমি যে অমঙ্গলের জন্য বৃক্ষের দিকে হাত বাড়িয়েছিলে।
আমি ক্রুশে নিদ্রা গিয়েছিলাম, হঠাৎ একটি বর্শার আঘাতে আমার বুকের পাশ বিদ্ধ হল, তোমারই জন্য—তুমি যে পরমদেশে নিদ্রা গেলে আমি তোমার বুকের পাশ থেকে হবাকে গড়ে তুলেছিলাম। আমার পাশ তোমার পাশের যন্ত্রণা নিরাময় করল। আমার নিদ্রা পাতালের নিদ্রা থেকে তোমাকে বের করবে। আমার বর্শা সেই বর্শা প্রতিরোধ করল যা তোমার দিকে লক্ষ করছিল।
ওঠ, এখান থেকে চলে যাই। শত্রু তোমাকে পরমদেশ থেকে বের করে দিয়েছিল; আমি কিন্তু তোমাকে সেই পরমদেশে আর নয়, স্বর্গীয় সিংহাসনেই আসন দেব। জীবনবৃক্ষ স্পর্শ করতে তোমাকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল; এই দেখ, জীবন যে আমি, সেই আমি তোমার সঙ্গে সংযুক্ত। আমি খেরুবদূতদের নিয়োগ করেছিলাম তারা যেন তোমাকে সন্তানের মত রক্ষা করে; আমি আজ এমনটি করছি, যেন খেরুবদূতেরা ঈশ্বরোচিত মর্যাদা দেখিয়ে তোমাকেও পূজা করে। স্বর্গীয় সিংহাসন এবার তৈরী, বাহকেরা তৎপর ও প্রস্তুত, ভোজালয় নির্মিত, খাদ্য প্রস্তুত, শাশ্বত আবাস ও গৃহগুলো অলঙ্কৃত, মঙ্গলদানের ঐশ্বর্যের সিন্দুক উন্মুক্ত, ও অনাদিকাল থেকে প্রস্তুত স্বর্গরাজ্য তোমার অপেক্ষায় রয়েছে।

৬। জাখারিয়ার গীতিকা
ধুয়ো: আমাদের ত্রাণ কর গো পরিত্রাতা।
তোমার ক্রুশ ও রক্ত দ্বারা তুমি আমাদের করেছ উদ্ধার।
আমাদের সহায়তায় এসো,
হে প্রভু, আমাদের পরমেশ্বর।

ধন্য প্রভু, ইস্রায়েলের পরমেশ্বর,
কারণ আপন জনগণকে দেখতে এসেছেন, সাধন করেছেন তাদের মুক্তিকর্ম,
এবং তাঁর দাস দাউদের কুলে
আমাদের জন্য ঘটিয়েছেন এক ত্রাণশক্তির জাগরণ,

যেমনটি তাঁর প্রাচীনকালের পবিত্র নবীদের মুখ দিয়ে বলেছিলেন,
আমাদের শত্রুদের ও সকল বিদ্বেষীদের হাত থেকে পরিত্রাণের কথা:
আমাদের পিতৃপুরুষদের প্রতি দয়া করবেন
আর তাঁর পবিত্র সন্ধির কথা স্মরণে রাখবেন,

সেই যে শপথ তিনি উচ্চারণ করেছিলেন আমাদের পিতা আব্রাহামের প্রতি:
আমাদের শত্রুদের হাত থেকে নিস্তার পেয়ে
আমরা যেন নির্ভয়ে পবিত্রতা ও ধর্মময়তার সঙ্গে
তাঁর সাক্ষাতে তাঁর সেবা করতে পারি আমাদের সমস্ত দিন।

আর তুমি, শিশু, পরাৎপরের নবী বলে অভিহিত হবে,
কারণ প্রভুর আগে আগে চলবে তাঁর পথ প্রস্তুত করতে,
তাঁর জনগণকে জানিয়ে দিতে
তাদের পাপমোচনে সাধিত পরিত্রাণের কথা,

আমাদের পরমেশ্বরের স্নেহময় দয়ায়,
যে দয়ায় উদীয়মান জ্যোতি ঊর্ধ্ব থেকে আমাদের দেখতে আসবেন
তাদেরই আলো দিতে, যারা বসে আছে অন্ধকারে ও মৃত্যু-ছায়ায়,
আমাদের চরণ চালিত করতে শান্তির পথে।

সর্বস্রষ্টা পিতা,
বিশ্বত্রাতা পুত্র,
সান্ত্বনাদানকারী পবিত্র আত্মা,
ত্রিত্বের গৌরব হোক চিরকালের মত। আমেন।   [ধুয়ো]

৭। মিনতি নিবেদন
যিনি আমাদের জন্য যন্ত্রণাভোগ ও মৃত্যুবরণ করে অনন্ত জীবনে পুনরুত্থান করার জন্য সমাহিত হয়েছেন, আসুন, কৃতজ্ঞতা ও ভক্তির সঙ্গে আমাদের সেই পরিত্রাতার কাছে মিনতি জানাই:
    সকলে: হে প্রভু, দয়া কর।
-হে পরিত্রাতা খ্রিষ্ট, ক্রুশের তলায় ও সমাধিগুহার কাছে তোমার মা উপস্থিত ছিলেন। কৃপা কর, সঙ্কটকালে আমরা যেন তোমার যন্ত্রণাভোগের সহভাগী হতে পারি।
    সকলে: হে প্রভু, দয়া কর।
-হে নব আদম খ্রিষ্ট, তোমার মৃত্যুর কথা শুনে নরক ভয়তে কাঁপতে লাগল, নরকের দরজা কবজা থেকে খুলে পড়ল, যত কবরের মুখ খুলে গেল, আদি থেকে যারা নরকের বন্দি ছিল, তারা মুক্তি লাভ করল। পাপে বন্দি যারা, তোমার বাণী শুনে তারা যেন তোমার সঙ্গে পুনরুত্থান করতে পারে।
    সকলে: হে প্রভু, দয়া কর।
-হে ঈশ্বরপুত্র খ্রিষ্ট, বাপ্তিস্মের মধ্য দিয়ে তুমি আত্মিকভাবে আমাদের তোমার মৃত্যু ও সমাধিতে মিলিত করেছ। আশীর্বাদ কর, আমরা যেন তোমার পুনরুত্থানে নবরূপায়িত হয়ে নবজীবন যাপন করতে পারি।
    সকলে: হে প্রভু, দয়া কর।
-হে জীবনস্বামী, সমাধিগুহাতে শুয়ে তুমি পিতার ডাকের অপেক্ষায় ছিলে, যে ডাক শুনে তুমি প্রথম পুনরুত্থিত মানুষরূপে এবং আমাদের পুনরুত্থানের আশা ব’লে নবজীবনে জেগে উঠবে। আমরাও যেন তোমার গৌরবময় নিয়তির অংশীদার হতে পারি।
    সকলে: হে প্রভু, দয়া কর।

৮। প্রভুর প্রার্থনা।

৯। শেষ প্রার্থনা: এসো, প্রার্থনা করি।
হে সর্বশক্তিমান সনাতন ঈশ্বর,
তোমার একমাত্র পুত্র পাতালে অবরোহণ করে সেখান থেকে আবার সগৌরবে আরোহণ করেছেন।
অনুনয় করি তোমায়: যারা বাপ্তিস্মের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে সমাহিত হয়েছে,
তারা যেন তাঁর পুনরুত্থান গুণে অনন্ত জীবন লাভ করতে পারে।
পবিত্র আত্মার ঐক্যে, তোমার সঙ্গে, বিশ্বরাজ ও জীবনেশ্বর রূপে তিনি যুগে যুগে বিরাজমান।
সকলে: আমেন।

১০। বিদায়
-এসো, প্রভুকে বলি ধন্য।
    - ঈশ্বরকে ধন্যবাদ।

আজ বিকালেই তপস্যাকালের সমাপ্তি; এবং সন্ধ্যায় পাস্কাকালের আরম্ভ।
সুতরাং, নিশিজাগরণীর জন্য পাস্কাকাল দ্রঃ।

[সূচী]